February 2, 2026, 3:38 pm


S M Fatin Shadab

Published:
2026-02-02 13:37:49 BdST

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ শুধু ক্রিকেট নয়, ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন


আধুনিক ক্রিকেট অর্থনীতিতে কিছু ম্যাচ ট্রফির চেয়েও বড়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচটি শুধু সূচির একটি লড়াই নয়-ধরা হয় এটাই মূল ম্যাচ। এই একটি ম্যাচই পুরো টুর্নামেন্টের অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তোলে, সম্প্রচারমূল্য বাড়ায় এবং নীরবে এমন অনেক ক্রিকেট বোর্ডকে আর্থিকভাবে টিকিয়ে রাখে, যারা নিজেরা কখনোই এমন মনোযোগ বা আয় তৈরি করতে পারে না।

 

এই প্রেক্ষাপটে, পাকিস্তান সরকার বিশ্বকাপে দলের অংশগ্রহণে অনুমতি দিলেও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে অনুমতি না দেওয়ায় আইসিসির সতর্ক ভাষায় দেওয়া বিবৃতিটি কার্যত একটি “ওয়ার্নিং শট” হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

আইসিসির ভাষায়, ‘আইসিসি আশা করে, পিসিবি নিজেদের দেশের ক্রিকেটের ওপর এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর প্রভাব বিবেচনা করবে, কারণ এটি বৈশ্বিক ক্রিকেট পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—যার সদস্য ও উপকারভোগী পাকিস্তান নিজেই।’

 

ক্রিকেটের সরল আর্থিক ভাষায় এর অর্থ দাঁড়ায়—এটা শুধু রাজনীতি নয়, এটা বিপুল অঙ্কের টাকার প্রশ্ন।

৫০০ মিলিয়ন ডলারের ম্যাচ

ভারত-পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি ম্যাচটির মোট আর্থিক মূল্য কমপক্ষে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বলে ধরা হয়। সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি এবং বৈধ বেটিংসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম মিলিয়ে এই হিসাব করা হয়েছে।

ক্রিকেটে আর কোনো একক ম্যাচ এই অঙ্কের কাছাকাছিও যায় না।

সম্প্রচার সংস্থাগুলোর কাছে এটি ‘ক্রাউন জুয়েল’। ভারত-পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনমূল্য সাধারণত ২৫-৪০ লাখ রুপি, যা অন্য যে কোনো বড় ম্যাচের চেয়েও অনেক বেশি। এই ম্যাচ বাদ পড়লে পুরো টুর্নামেন্টের আর্থিক কাঠামোই নড়ে যায়।

কার ক্ষতি, কতটা?

সম্প্রচার সংস্থার ধাক্কা

সবচেয়ে তাৎক্ষণিক আঘাত পড়ে সম্প্রচার স্বত্বাধিকারীর ওপর। শুধু বিজ্ঞাপন থেকেই এই ম্যাচে আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকা আয় হওয়ার কথা।

সম্প্রচার সংস্থাগুলো নিশ্চিততা চায়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হঠাৎ বাদ পড়া সূচি জটিলতা নয়-এটি সরাসরি মূল্যহানির ঘটনা। জিওস্টার ইতিমধ্যেই আর্থিক ক্ষতির কারণে আইসিসির কাছে রিবেট চেয়েছে, আর এই পরিস্থিতি তাদের দাবি আরও জোরালো করবে।

বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের অভ্যন্তরীণ মূল্য ধরা হয় প্রায় ১৩৮.৭ কোটি রুপি।

এই ধাক্কা ছড়িয়ে পড়ে সবার মধ্যে

সম্প্রচার সংস্থা ক্ষতিপূরণ চাইলে তার চাপ পড়ে আইসিসির ওপর-এবং সেখান থেকে তা গড়িয়ে পড়ে সব সদস্য বোর্ডে।

কেন্দ্রীয় আয়ের পরিমাণ কমে গেলে শুধু ভারত বা পাকিস্তান নয়, বরং অ্যাসোসিয়েট ও ছোট পূর্ণ সদস্য দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যারা আইসিসির অর্থ বণ্টনের ওপর নির্ভরশীল।

ভারত ও পাকিস্তান: দুই দেশের দুই বাস্তবতা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ম্যাচটি না হলে ভারত ও পাকিস্তান-দুই বোর্ডই সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০০ কোটি রুপি করে হারাতে পারে।

ভারতের জন্য এটি কষ্টকর হলেও সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এটি হয়ে দাঁড়ায় অস্তিত্বের হিসাব।

পিসিবি আইসিসির মোট আয়ের ৫.৭৫ শতাংশ পায়, যা বছরে প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। এই আয় নির্ভর করে নিয়ম মেনে অংশগ্রহণ, নির্ভরযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতার ওপর।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—

স্বেচ্ছায় ম্যাচ বর্জন করলে তা ফোর্স মেজর হিসেবে গণ্য হয় না।

এর অর্থ: কোনো বীমা সুরক্ষা নেই, আইনি সুরক্ষা নেই, ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার সম্পূর্ণ দায়, আইসিসির সদস্য চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ, টুর্নামেন্ট ফি আটকে রাখা, অতিরিক্ত জরিমানা, এমনকি সম্প্রচার সংস্থার আইনি মামলার ঝুঁকি।

সব মিলিয়ে ক্ষতির অঙ্ক কয়েক মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি: বিশ্বাসযোগ্যতা টাকার চেয়েও দামী

সবচেয়ে বিপজ্জনক ক্ষতি একবারের জরিমানা নয়-বরং সুনামহানি।

সম্প্রচার সংস্থাগুলো অনিশ্চয়তা অপছন্দ করে। একটি বয়কট পাকিস্তানের ম্যাচগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। এর ফল হতে পারে—

ভবিষ্যতে পাকিস্তান সংশ্লিষ্ট সম্প্রচারমূল্য কমে যাওয়া, স্বত্ব প্যাকেজে ছাড়, স্পনসরদের আগ্রহ হ্রাস

অর্থাৎ, আজকের একটি ম্যাচ না খেলা আগামী বহু বছর ধরে আয়ের ক্ষয় ডেকে আনতে পারে।

আইসিসির রাজস্ব বণ্টন শুধু অঙ্কের হিসাব নয়-বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিয়ম মানাও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব বোর্ডকে অনির্ভরযোগ্য মনে করা হয়, ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক আলোচনায় তারা বাড়তি সুবিধা পায় না।

আর আছেন সমর্থকেরা

এই আর্থিক হিসাবের আড়ালে হারিয়ে যান হাজারো সমর্থক, যারা বিশেষভাবে এই ম্যাচটির জন্য টিকিট, হোটেল ও বিমানের টিকিট বুক করেছিলেন। তাদের ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যান নয়—তাৎক্ষণিক, ব্যক্তিগত এবং অপূরণীয়।

শেষ ওভার

ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ এখন আর শুধু ক্রিকেট নয়। এটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলোর আর্থিক চালিকাশক্তি।

এই ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ানো মানে শুধু একটি বিশ্বকাপ ম্যাচ হারানো নয়-বরং সম্প্রচার সংস্থা, আইসিসি, সদস্য বোর্ড, স্পনসর ও সমর্থকদের মধ্যে কম্পন ছড়িয়ে দেওয়া।

স্বল্প ও দীর্ঘ-দুই মেয়াদেই সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। বিশ্বকাপের পয়েন্ট টেবিল ভুলে গেলেও, এই সিদ্ধান্তের আর্থিক বিল পিসিবিকে দীর্ঘদিন তাড়া করতে পারে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.