January 11, 2026, 12:26 pm


আব্দুর রহিম রিপন

Published:
2026-01-10 22:54:14 BdST

তেজতুরি বাজারের রক্তাক্ত রাত: মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যে তিনটি জটিল সমীকরন


তেজতুরি বাজারের রক্তাক্ত রাত: মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যে তিনটি জটিল সমীকরন

আব্দুর রহিম রিপন

স্টাফ রিপোর্টার 

ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল—দিনভর কর্মব্যস্ত মানুষের কোলাহলে ভরা এই এলাকা বুধবার রাতে হঠাৎ করেই রূপ নেয় আতঙ্ক আর রক্তাক্ত অধ্যায়ের সাক্ষীতে। রাত আনুমানিক সাড়ে দশটার দিকে তেজতুরি বাজারের অদূরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হন কারওয়ান বাজার ভ্যানচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদ।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি রাজনৈতিক নেতার প্রাণহানি নয়—বরং এটি রাজধানীর অপরাধ, রাজনীতি, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসের ভয়াবহ বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। ঘটনার পর থেকেই পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্ত ঘুরপাক খাচ্ছে তিনটি প্রধান সম্ভাব্য কারণকে কেন্দ্র করে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তিনটি সূত্রই পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, যা পুরো ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রক্তাক্ত সেই মুহূর্ত
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, মুসাব্বির সেদিন রাতের খাবারের পর বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি। তেজতুরি বাজারের কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ একটি মোটরসাইকেল এসে থামে। আরোহীরা হেলমেট পরা ছিল, মুখ ঢাকা। মুহূর্তের মধ্যেই পিস্তল বের করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া শুরু হয়।
গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মুসাব্বির। পাশে থাকা আবু সুফিয়ান মাসুদও গুলিতে আহত হন। আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু হয় আশপাশের মানুষের মধ্যে। হামলাকারীরা দ্রুত মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মুসাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। আবু সুফিয়ান মাসুদকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
পরিবারের কান্না আর শেষ কথার ভার
মুসাব্বিরের মৃত্যু শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনে নয়, তার পরিবারেও নামিয়ে এনেছে গভীর শোক। তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম জানান, সেদিন রাতে বের হওয়ার আগে মুসাব্বির তাকে কফি বানাতে বলেছিলেন। তিনি রান্নাঘরে যাওয়ার আগেই মুসাব্বির ফোনে একটি কল পান এবং দ্রুত বেরিয়ে যান। “ওই কফিটা আর বানানো হয়নি,”—কাঁদতে কাঁদতে বলেন তিনি।
পরদিন তিনি তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের উল্লেখ করা হয়। তবে মামলার এজাহারে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা তদন্তের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তদন্তে যে তিনটি বড় কারণ
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত তদন্তে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রথমত: কারওয়ান বাজার ও আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ।
মুসাব্বির দীর্ঘদিন ধরে কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন শ্রমিক ও পরিবহন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাজার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা বণ্টন ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নিয়ে সেখানে একাধিক গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, এই আধিপত্যের লড়াই থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত: সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্রের সম্পৃক্ততা।
হামলার ধরন দেখে পুলিশ বলছে, এটি কোনো তাৎক্ষণিক রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়। বরং পরিকল্পিত ‘টার্গেট কিলিং’। ব্যবহৃত অস্ত্র, হামলার সময় ও পালানোর কৌশল—সব মিলিয়ে এটি পেশাদার অপরাধীদের কাজ বলে মনে করা হচ্ছে। রাজধানীতে সক্রিয় কয়েকটি শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের গতিবিধি নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তৃতীয়ত: রাজনৈতিক বিরোধ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
মুসাব্বির ছিলেন পরিচিত রাজনৈতিক মুখ। দলীয় রাজনীতিতে তার উত্থান যেমন দ্রুত ছিল, তেমনি কিছু অভ্যন্তরীণ বিরোধও ছিল বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। দলীয় আধিপত্য, প্রভাব বিস্তার এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন কি না—তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত
ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফুটেজে দেখা গেছে, হামলার আগে মোটরসাইকেলটি কিছুক্ষণ এলাকায় ঘোরাঘুরি করে। গুলিবর্ষণের পর তারা দ্রুত ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যায়। যদিও মুখ ঢাকা থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, ফুটেজ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মোটরসাইকেলের গতিপথ, সম্ভাব্য পালানোর রুট এবং আগে-পরে তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিক্রিয়া
মুসাব্বির হত্যার ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সংগঠনের নেতারা এটিকে ‘রাজনৈতিক হত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দিয়েছেন।
এর পাশাপাশি রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বক্তারা বলেছেন, “এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে দেশে রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা বলে কিছু থাকবে না।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জনবহুল এলাকায় রাতের বেলায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা—এটি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতি, রাজনীতি ও অপরাধ যখন একসঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন এমন সহিংসতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, বরং এই অবৈধ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মূল উৎসে আঘাত হানতে হবে।
শেষ কথা
তেজতুরি বাজারের সেই রাত শুধু একটি জীবন কেড়ে নেয়নি, বরং বহু প্রশ্ন রেখে গেছে। কে বা কারা এই হত্যার নির্দেশ দিল? এর পেছনে কি শুধুই বাজার দখলের লড়াই, নাকি এর চেয়েও গভীর কোনো রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে? তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের মৃত্যু রাজধানীর অপরাধ ও রাজনীতির অন্ধকার বাস্তবতাকে আরও একবার নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই হত্যাকাণ্ড সত্যিকার অর্থে বিচার পায়, নাকি আরও অনেক ঘটনার মতো এটি সময়ের গহ্বরে হারিয়ে যায়।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.