January 25, 2026, 11:00 pm


মোস্তফা কামাল আকন্দ

Published:
2026-01-25 18:37:18 BdST

এক মডেলের ঋণ আর চলবে না; অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা ও বাজার সংযোগই প্রান্তিক মানুষের জীবন রক্ষা করবেক্ষুদ্রঋণ আরও শক্তিশালী হবে, যদি বাস্তবতা স্বীকার করা হয়


বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাস্তবতা বদলেছে। দেশের উপকূল, হাওর ও চরাঞ্চলের আয়ের চক্র, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বাজার সংযোগের বৈচিত্র্য একক ঋণ-মডেলকে কার্যহীন করে তুলেছে।

জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং পিকেএসএফ -এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় প্রতি বছর গড়ে ২–৩ মাস আয়ের শূন্যতা দেখা যায়। হাওরে এক ফসলি অর্থনীতি বন্যার কারণে পুরো মৌসুমে বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে থাকে। চরাঞ্চলে নদীভাঙন ও বাজার বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রান্তিক উৎপাদকদের নেট মুনাফা ১৫–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এই তথ্য স্পষ্ট করে—একক ঋণ-মডেল বজায় রাখা এখন আর সম্ভব নয়।

নীতিনির্ধারকরা অবহেলা করতে পারবে না। ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প নকশায় অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবতা, ঝুঁকি এবং বাজার সংযোগ উপেক্ষা করলে শুধু ঋণ খেলাপি বৃদ্ধি পায় না, উদ্যোক্তার আত্মবিশ্বাসও ক্ষুণ্ণ হয়, সামাজিক লক্ষ্যও ব্যাহত হয়।

পিকেএসএফ এবং আন্তর্জাতিক এনজিও-গুলোর ২০২৪–২৫ সালের মূল্যায়ন দেখাচ্ছে, যেখানে স্থানীয় বাজার ও মৌসুমি আয়ের ভিত্তিতে ঋণ-পণ্য অভিযোজিত হয়েছে, খেলাপি ঋণের হার ৪–৫ শতাংশের নিচে আছে, আর উদ্যোক্তার আয় ২০–২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে একক মডেল প্রয়োগ হয়েছে, সেখানে খেলাপি ঋণ ১২–১৫ শতাংশ এবং উদ্যোক্তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণে চারটি পদক্ষেপ গ্রহন করা হলে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব বলে আশা করা যায়।

• ঋণকে প্রকৃত অর্থে এন্টারপ্রাইজ-কেন্দ্রিক করা

• অঞ্চলভিত্তিক উদ্যোগ নির্বাচন করা

• মৌসুমি আর্থিক পণ্য যেমন গ্রেস পিরিয়ড, মৌসুমি কিস্তি, সঞ্চয় ও মাইক্রো-ইনশিওরেন্স সংযুক্ত করা

• বাজার চুক্তি বা সংগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা

• লক্ষ্যভিত্তিক দক্ষতা ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রদান

এই চারটি পদক্ষেপই টেকসই ক্ষুদ্রঋণের ভিত্তি গড়ে। উদাহরণস্বরূপ, উপকূলীয় এলাকায় মৎস্য, কাঁকড়া ও লবণসহিষ্ণু ফসল; হাওরে হাঁস–মাছ–ধানের সমন্বিত মডেল; চরাঞ্চলে গবাদিপশু, সবজি ও ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে আয়ের চক্র স্থিতিশীল করা সম্ভব।

দুর্যোগ-পরবর্তী পুনঃঅর্থায়ন ও বীমা ছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা টিকে থাকতে পারবে না। এই বাস্তবতাই পিকেএসএফ এবং এনজিও রিপোর্টে বারবার তুলে ধরা হয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের এখন স্পষ্ট বার্তা দেওয়া উচিত—ক্ষুদ্রঋণ কোনো সামাজিক রূপান্তরের অলঙ্কার নয়; এটি কার্যকর আর্থিক হাতিয়ার হতে হলে নীতি, বাজেট ও তহবিলের পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

অঞ্চলভিত্তিক ডেটা ব্যবহার করে ঋণ নকশা করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বীমা ও পুনঃঅর্থায়ন বাধ্যতামূলক করা এবং এনজিও ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় জোরদার করা অত্যাবশ্যক।

জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো, পিকেএসএফ ও মাঠ পর্যায়ের এনজিও-র ইভ্যালুয়েশন নিশ্চিত করেছে যে এই কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো, উদ্যোক্তার আয় বৃদ্ধি ও সামাজিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

সংক্ষেপে, একক ঋণ-মডেল থেকে সরে এসে ডেটা-নির্ভর, অঞ্চলভিত্তিক ও এন্টারপ্রাইজ-কেন্দ্রিক সংস্কারই ক্ষুদ্রঋণকে দায় নয়, টেকসই উন্নয়নের সুযোগে রূপান্তর করতে পারে।

নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া প্রান্তিক মানুষের জীবিকা ও দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে থাকবে।

লেখক একজন উন্নয়ন কর্মী ও নীতি বিশ্লেষক

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.