March 31, 2026, 5:02 pm


সামিউর রহমান লিপু

Published:
2026-03-31 13:05:38 BdST

সিন্ডিকেটের কার্যক্রমের চাঞ্চল্যকর তথ্যপ্রমাণ এফটি টীমের হাতেশেনজেনভুক্ত দেশের জাল ভিসা চক্রের মূলহোতা থাইল্যান্ড-প্রবাসী ওমর ফারুক


সোমবার (৩০ মার্চ) ঢাকার শেনজেনভুক্ত দেশের দূতাবাসগুলো এক বার্তায় শেনজেন ভিসা পেতে জাল কাগজপত্র জমা দিলে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হবে বলে জানিয়েছে।

উক্ত বার্তায় ঢাকায় অবস্থিত শেনজেনভুক্ত দেশগুলোর দূতাবাস ভিসা আবেদনকারীদের উদ্দেশ্য বলেছে, "আপনার আবেদনের সঙ্গে শুধুমাত্র মূল এবং অপরিবর্তিত কাগজপত্র জমা দিন। জাল বা কারসাজি করা কাগজপত্র জমা দিলে আপনার আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হবে।"

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ এবং এই সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন গনমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনসমূহ আমলে নিয়েই সোমবার এই কঠোর বার্তা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশে অবস্থিত শেনজেনভুক্ত দেশগুলোর দূতাবাস।

উল্লেখ্য, গত দুই থেকে ৩ বছর যাবৎ ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দেশের অসহায় মানুষদের বিদেশে পাঠাচ্ছে একটি প্রতারক চক্র। এই চক্রের নানা অনিয়ম ও কাগজপত্র জালিয়াতি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ফিন্যান্স টুডে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার জাল ভিসা সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বেশকিছু তথ্যপ্রমাণ এফটি টীমের হাতে এসেছে। এই বিষয়ে আজ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: থাইল্যান্ড ও ফ্রান্সে বসে মানবপাচারে নেতৃত্ব দিচ্ছে দুই বাংলাদেশী

মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও আসিয়ানভুক্ত দেশে সক্রিয় মানবপাচার চক্রের মূল হোতা থাইল্যান্ডপ্রবাসী মো: ওমর ফারুক ইউরোপের বহুল আকাঙ্ক্ষিত শেনজেন ভিসার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরী করে জমা দিয়ে থাকে। এমনকি অভিযুক্ত মো: ওমর ফারুক শেনজেন ভিসার কপিও জাল করে অনেককেই সুবিধাজনক সময়ে ইউরোপে ঢুকিয়েছে।

সম্প্রতি, খুলনার এক ব্যবসায়ীকে ইউরোপেরর অন্যতম রাষ্ট্র স্পেনে পাঠানোর কথা বলে ২০২৩ সালের আগষ্ট মাস থেকে কয়েক দফায় প্রায় ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেয় অভিযুক্ত ওমর ফারুক। প্রায় দুই বছর নানা টালবাহানা করে কাটিয়ে অবশেষে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে বৈধভাবেই থাইল্যান্ডে নিয়ে যায়। পরে দুই মাস সেখানে রেখে স্পেনের ভিসা করার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে অভিযুক্ত ফারুক।

ব্যাংককের একটি রেষ্টুরেন্টে ইফতারের আগ মুহুর্তে অভিযুক্ত ফারুক ও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী

পরবর্তীতে, থাইল্যান্ডের সক্রিয় পাকিস্তানি এক চক্রের সাথে যোগসাজশের মাধ্যমে উক্ত ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর নামে ভুয়া কাগজপত্র তৈরী করে এবং স্পেনের জাল ভিসা বানিয়ে ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর দিয়ে পাঠানোর পরিকল্পনা করে। অবশেষে, পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক ২০২৫ সালের ২৫শে এপ্রিল ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীকে জাল ভিসা দিয়ে স্পেনে পাঠানোর প্রাক্কালে থাইল্যান্ডের ইমিগ্রেশন বিভাগের চৌকষ এক কর্মকর্তা এই জালিয়াতি ধরে ফেলেন এবং মানবতার খাতিরে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর বক্তব্য আমলে নিয়ে তাকে আটক না করে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে।

বাংলাদেশে ফিরে সর্বশান্ত ঐ ব্যবসায়ী যোগাযোগ করেন বেশ কয়েকটি গনমাধ্যমের সাথে এবং এই চক্রের বিস্তারিত তুলে ধরেন। এরপর থেকে আলোচিত এই চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল 'দ্য ফিন্যান্স টুডে', 'দ্য ইনভেষ্টর' এবং 'দৈনিক বর্তমানদিন' পত্রিকা।

একাধিক সূত্র মতে, এই প্রতারক চক্রের মূল হোতা হচ্ছে থাইল্যান্ডপ্রবাসী মো: ওমর ফারক। আর এই ঘৃন্য কার্যক্রমে তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছেন ফারুকের আপন সহোদর মো: শাহজাহান, ফ্রান্সে বসবাসরত মুন্সীগঞ্জের ইউনুস, গুলশানের ডাচ-বাংলা ব্যাংকে কর্মরত জনৈক আখতারুজ্জামান সহ আরও অনেকেই।

সূত্রমতে, দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া পারমিট-জাল ভিসা-ভুয়া টিকিট তৈরির সঙ্গে জড়িত থাইল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশী মো: ওমর ফারুক কাতারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মাস ড্রীম গ্রুপের সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার সহিদুর রহমান সৈকতের ঢাকাস্থ কার্যালয় ব্যবহার করে এই প্রতারণা চালিয়ে আসছে।

থাইল্যান্ডে অর্থপাচারে অভিযুক্ত মেসার্স শামস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল

এছাড়াও, এই চক্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঢাকার উত্তরায় থাকা পার্সেল ও কুরিয়ার সার্ভিস মেসার্স শামস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। এই চক্র ভুক্তভোগীদের নিকট থেকে যে টাকা সংগ্রহ করে তার অধিকাংশই দেশ থেকে পাচারে উক্ত প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করার বিনিময়ে সহযোগিতা করে থাকে।

এই বিষয়ে জানতে চেয়ে অভিযুক্ত মো: ওমর ফারুকের ৩টি বিদেশী নাম্বারে (দুটি থাইল্যান্ডের এবং একটি দুবাইয়ের) দ্য ফিন্যান্স টুডের বিশেষ প্রতিনিধি একাধিকবার কল ও মেসেজ দিলেও তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উপরন্তু এই বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের জেরে ভুক্তভোগী ঐ ব্যবসায়ীকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে অভিযুক্ত মো: ওমর ফারুক। এমনকি, মামলা করলেও তার কিছুই হবে না বলে দম্ভোক্তি প্রকাশ করেছে উক্ত ফারুক।

এর আগেও থাইল্যান্ড প্রবাসী মো: ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত একাধিক অভিযোগের সূত্র ধরে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র আগামী পর্বে ওমর ফারুক গংয়ের জাল ভিসা ও কাগজপত্র তৈরীর কারসাজি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।

এই অসাধু এবং ভয়ংকর সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি সর্বস্ব খুইয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে কূটনৈতিক মহল ও বহির্বিশ্বে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি বহু যুবককে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও অনেকেই এই সিন্ডিকেটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.