April 20, 2026, 12:37 am


শাহীন আবদুল বারী

Published:
2026-04-19 21:45:09 BdST

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনত্যাগীরাই হচ্ছেন সংরক্ষিত নারী এমপি


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের জোটের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নিয়ে দলীয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত হিসাব অনুযায়ী, এবারের সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পেতে যাচ্ছে ৩৬টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট ১৩টি আসন এবং ১টি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

দলীয় নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপি এবার বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাকে। এছাড়া সংসদ কাঁপাতে পারে এমন নেত্রীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। একইসঙ্গে দলটি ‘এক পরিবারের এক প্রার্থী’ নীতি অনুসরণ করতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।

বিএনপি এবার যেভাবে সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি নির্বাচন করতে যাচ্ছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কয়েকটি স্তরে যাচাই-বাছাই করে ত্যাগী এবং দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, সত্যিকারের রাজনৈতিক কর্মীদের ছেঁকে আলাদা করা হচ্ছে।

বিএনপি এবার প্রার্থী বাছাইয়ে প্রথমত মনোনয়নপত্র বিক্রি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিল। এর ফলে কলেজে পড়ুয়া কোনো নারী ছাত্রদল কর্মীও যেমন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে পেরেছে, তেমনি অরাজনৈতিক বা বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী যে কেউ মনোনয়ন ফরম তোলার সুযোগ পেয়েছেন। এরপর থেকেই চমকের শুরু।

দ্বিতীয় ধাপে, প্রার্থী বাছাই শুরু করার পর মনোনয়ন ফরম জমাদানে জামানত বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এর ফলে যারা অযথাই কিংবা ফটোশ্যুট করার জন্য বা পার্টি হাইকমান্ডের নজরে আসার জন্য মনোনয়ন ফরম তুলেছেন তারা আর মনোনয়ন ফরম জমাদান প্রক্রিয়া পর্যন্ত এগোতে আগ্রহী হবে না।

এছাড়া, সবাইকে মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার সঙ্গে অবশ্যই সিভি যোগ করতে নির্দেশ দিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। এখানে আরেক ধাপে বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো।

একইসাথে, নিজে কিংবা স্বামীর নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে সেসব প্রতিষ্ঠানের নামে কোনও ঋণ নেয়া থাকলে তার বিস্তারিত তথ্যপ্রদান, ফৌজদারি মামলা থাকলে তার বিবরণ এবং এসব নিয়ে ক্লিয়ার স্টেটমেন্ট দিতে হয়েছে। যারা এই সকল ক্রাইটেরিয়া মেনে ফরম জমাদান পর্যন্ত এসেছেন; তাদেরকে ডাকা হয়েছে ভাইভার জন্য।

সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির এই প্রক্রিয়াটি একবারে অপ্রত্যাশিত ছিল। আগ্রহী প্রার্থীদের কেউ ভাবতেও পারেননি যে এমন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি তাদের হতে হবে। অতীতে এরকম প্রক্রিয়ায় প্রার্থী বাছাই করতে কখনোই দেখা যায়নি। অতীতে বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সিগন্যালের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট প্রার্থীরা মনোনয়ন ফরম তুলতেন। কিন্তু এবার আর তা হয়নি।

দুইদিনে প্রায় সাড়ে ৯০০ জন মুখোমুখি হয়েছেন দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের। যার নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত শুক্র-শনি, দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্তই চলছে এই কর্মযজ্ঞ।

প্রাথমিক আলোচনায় যাঁদের নাম গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, মহিলা দলের সহ-সভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, মহিলা দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা অপূর্না রায়, হাসিনা আহমেদ, রুমানা আহমেদসহ আরও অনেকে।

সম্ভাব্য চূড়ান্ত তালিকায় আলোচনায় থাকা উল্লেখযোগ্য নাম দলীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলে যাঁদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি সুলতানা আহমেদ, সাবেক এমপি রাশেদা বেগম হিরা, নিলুফার চৌধুরী মনি, শাম্মী আক্তার, রেহানা আক্তার রানু, সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, সংগীত শিল্পী বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভিন, কনক চাঁপা, সাবেক ছাত্রদল নেত্রী হাসনা হেনা হীরা, অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, জেবা আমিন খান, বীথিকা বিনতে হোসাইন, সানাজিদা ইসলাম তুলি, ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, ফাতেমা বাদশা, অ্যাডভোকেট রোকসানা বেগম শাহনাজ, অ্যাডভোকেট আরিফা জেসমিন, নাজনীন মাহমুদ, জেলী চৌধুরী, ডা. লুনা খোন্দকার, শাহিনুর নার্গিস, এডভোকেট রেজাকা সুলতানা ফেন্সী, সামিমা আক্তার রুবি, বিলকিস আক্তার নীলা, এডভোকেট মিনা বেগম মিনি, মমতাজ হোসেন লিপি, লুৎফা খানম স্বপ্না চৌধুরী, খাদিজা আক্তার বিনা, পাপিয়া ইসলাম, ফারজানা ইয়াসমিন রুমা, মুকুল আক্তার অনা, সীমা চৌধুরী, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, নিলুফা ইয়াসমিন নিলু, তানজিল চৌধুরী লিলি, এড. মমতাজ করিম, রোকসানা বেগম টুকটুকি, শাজাদী লায়লা আঞ্জুমান বানু, নাজমা আক্তার, ডা. রেয়ান আনিস, শাহিন সুলতানা বিউটি, ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুনি, আছমা শহীদ, রুনা গাজী, শেখ রুনা, সেলিনা সুলতানা নিশিতা, এড. আরিফা সুলতানা রুমা, এড. শাহানুর বেগম সাগর,পপি আক্তার, নাদিয়া পাঠান পাপন, সামিরা তানজিন চৌধুরী, সাবিনা খান, সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা সাবিরা সুলতানা প্রমুখ।

ভাইভাতে যে ৫টি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন প্রার্থীরা

> কবে থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন?

> বর্তমানে সংগঠনের কোন স্তরে কাজ করছেন?

> বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দলের জন্য আপনার অবদান কী? যেমন: মামলা থাকলে কয়টি, কীসের মামলা। হামলার শিকার হয়ে থাকলে কতবার, কখন এবং কোন আন্দোলনে, কোন প্রেক্ষিতে ইত্যাদি।

> কেন আপনি নিজেকে সংরক্ষিত নারী কোটায় দলের একজন সংসদ সদস্য হিসেবে সুযোগ পাওয়ার জন্য যোগ্য মনে করছেন?

> আপনাকে সিলেকশন করা হলে আপনি সংসদে গিয়ে ঠিক কীভাবে ভূমিকা রাখবেন দেশ এবং জনগণের জন্য?

মনোনয়ন ফরমের সকল তথ্য যাচাই, সিভি রিভিউ, দলের জন্য বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে অবদান পর্যালোচনা এবং ভাইভার পারফর্মেন্স, এই সবকিছু বিবেচনা করেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মনোনয়ন বোর্ড।

তবে এর মধ্যে হয়ত দু—চারটি সিটে বিশেষ বিবেচনা কিংবা কাটাছেঁড়া হবে, তা আগে থেকেই বলা যায়। এটি স্বাভাবিকও বটে।

দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারণে এখনও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক সমীকরণ, সাংগঠনিক ভারসাম্য, আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব এবং আন্দোলনে ভূমিকার ভিত্তিতে তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে জোর লবিং ও তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে, গৎবাঁধা প্রক্রিয়ায় ’পছন্দসই’ নারী এমপি বাছাই করা থেকে বেরিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিএনপি যেভাবে ত্যাগী এবং দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের থেকে এমপি বাছাই করা হচ্ছে, সেটি সত্যিই আশা জাগানিয়া। ত্যাগীদের মূল্যায়ন করার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে ব্যাপক নারী নেতৃত্ব তৈরি করা সম্ভব।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.