April 20, 2026, 12:35 am


শাহীন আবদুল বারী

Published:
2026-04-19 22:14:31 BdST

এবার বিএনপির মহাসচিব পদে থাকবে ভিন্নতা


দলের সাংগঠনিক কাজ গতিশীল করতে দীর্ঘ এক দশক পর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এ নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটি। আগামী ঈদুল আজহার পর এ কাউন্সিল হওয়ার কথা।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সীমাবদ্ধতায় নির্দিষ্ট সময়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়েছে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এবারে হবে সপ্তমবারের মতো।

এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর দলীয় ফোরামে বিএনপির কাউন্সিলের বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বিয়য়টি আলোচনায় উঠে আসে। আগামী ঈদুল আজহার পর কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি।

এই কাউন্সিল শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই কথা জানান।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে রাজনীতিতে। তবে আর না। এই কাউন্সিলের পর আমি অবসর নিতে চাই রাজনীতি থেকে। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আসন্ন কাউন্সিলে মহাসচিব পদে নতুন মুখ আসবে বলেও জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর এবার সপ্তম কাউন্সিল হতে যাচ্ছে। এবারের আয়োজন আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত ও অংশগ্রহণমূলক করার পরিকল্পনা করছে দলটি; যাতে কেন্দ্রের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়েও সম্পৃক্ততা বাড়ানো যায়। তবে এবার সামগ্রিক বিবেচনায় রাজনৈতিক পরিবেশ নিজেদের অনুকূলে থাকার কারণে দলীয় কাউন্সিলে থাকবে এক ভিন্নমাত্রা। দীর্ঘদিন পরে দলটিতে আসবে নতুন নেতৃত্ব।

জানা যায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির ১৯ জন সদস্য থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ১৪ জন সদস্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে দলের স্থায়ী কমিটি। তাদের মধ্যে কয়েকজন বয়সজনিত কারণে অসুস্থ বলে জানা গেছে। তবে বিএনপির চেয়ারম্যান চাইলে তার ক্ষমতাবলে স্থায়ী কমিটির শূন্য পদসমূহ কাউন্সিলের আগেই পূরণ করতে পারেন।

এদিকে, কাউন্সিল শেষেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। আসন্ন কাউন্সিলে মহাসচিব পদে নতুন মুখ আসবে বলেও জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনীতি থেকে মির্জা ফখরুলের অবসর নেয়ার ঘোষণার পরে মহাসচিবের বিষয়ে দলটির মধ্যে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারা অনুযায়ী ৮ বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা তারেক রহমান। তবে গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গত ৯ জানুয়ারি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি ভারমুক্ত হয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।

আর মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্বগ্রহণ করেন ২০১৬ সালের কাউন্সিলে। এই দুই পদে পুরোনোতেই ভরসা নাকি নতুন মুখ আসবে—তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে স্থায়ী কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদে আসছে নতুন নেতৃত্ব আসছে, এটা প্রায় নিশ্চিত। নতুন কমিটিতে স্থান পাবেন যোগ্য ও ত্যাগীরা। আলোচনায় আছেন অনেকে। পূরণ করা হবে স্থায়ী কমিটির শূন্যস্থানও।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘‘অতীতের চেয়ে এবারের কাউন্সিল নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কারণ বিগত ফ্যাসিবাদের সময় আমাদের সাংগঠনিক কাজে নানা প্রতিকূলতা ছিল। তাই কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হতো সাদামাটা। আশা করি এবারের কাউন্সিল হবে উৎসবমুখর। এতে দলের সর্বস্তরে আসবে নতুন নেতৃত্ব।’’ তিনি জানান, শিগগিরই কাউন্সিলের পথনকশা ঘোষণা করা হবে।

বিগত দিনে শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন যারা

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত ৬টি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করেছে দলটি। এর মাধ্যমে নির্বাচন করা হয় শীর্ষ নেতৃত্ব।

দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা। তবে বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং দলীয় নানা সীমাবদ্ধতায় তা নির্ধারিত সময়ে করা সম্ভব হয়নি।

এর মধ্যে প্রথম কাউন্সিল হয়েছে ১৯৭৮ সালের ১-২ সেপ্টেম্বর। এতে জিয়াউর রহমান দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। তার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালের ২৬-২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কাউন্সিলে চেয়ারম্যান হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। এরপর ৮৪ সালের পর থেকে দায়িত্ব পান খালেদা জিয়া। তৃতীয় ১৯৮৮ সালের ৩-৪ মার্চ, চতুর্থ ১৯৯৩ সালের ৪-৫ সেপ্টেম্বর ও পঞ্চম কাউন্সিল হয় ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। সেখানে পুনরায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া।

সর্বশেষ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ হয়েছে ষষ্ঠ কাউন্সিল। সেবারও চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। আর মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমৃত্যু চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন খালেদা জিয়া।

তারেক রহমানের অভিষেক

২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে পদাধিকার বলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান তার বড় ছেলে তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এরই মধ্যে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর মারা যান খালেদা জিয়া। এরপর চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়।

আলোচনায় যারা

বিএনপির এই গুরুত্বপূর্ণ পদে সম্ভাব্য নতুন মুখ নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। দলীয় সূত্র বলছে, আসন্ন কাউন্সিলকে সামনে রেখে কয়েকজন শীর্ষ নেতা আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন। ইতিমধ্যে যাদের নাম সবচেয়ে বেশী আলোচনায় রয়েছে তাদেরকে নিয়ে বিস্তারিত নিম্নে তুলে ধরা হলো।

সালাহউদ্দিন আহমেদ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে তার দক্ষতা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, নীতিনির্ধারণ ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি হাইকমান্ডের আস্থাভাজন হিসেবে বিবেচিত। নতুন প্রজন্ম ও নীতি-ভিত্তিক রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব হিসেবেও আলোচনায় তার নাম উঠে আসছে।

রুহুল কবির রিজভী

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘদিন দলের দপ্তর ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে রিজভীর।

দলের দুঃসময়ে নিয়মিত ব্রিফিং ও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় তৃণমূলেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাই দলের সম্ভব্য মহাসচিব পদে তার নামও আলোচনায় রয়েছে।

শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি দলের নীতি ও আদর্শের প্রতি অনুগত থেকে বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন।

সাংগঠনিক সংকট মোকাবিলা, কর্মী-সমর্থকদের একত্র রাখা এবং আন্দোলনকে গতিশীল করার ক্ষেত্রেও তার দক্ষতা প্রমাণিত।

দলীয় সূত্র বলছে, প্রায় ১৫ বছর ধরে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবসর ভাবনা এবং নতুন কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যেই এই পরিবর্তনের আলোচনা সামনে এসেছে।

এছাড়া দল ক্ষমতায় আসার পর সরকার ও দল—দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্য রাখতে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে বিএনপি। তবে শেষ পর্যন্ত কে মহাসচিব হচ্ছেন, তা নির্ভর করবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত এবং কাউন্সিলের ওপর। দলীয় নেতারা বলছেন, অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা- এই তিন মানদণ্ডেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.