May 12, 2026, 12:19 am


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-05-11 23:05:53 BdST

চাকুরী জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের দ্বারা বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগগণপূর্তের ই/এম বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্রয়কমিটিতে তালিকাভুক্তির জন্য তিনটি ফ্ল্যাট ও কোটি টাকার ঘুষ গ্রহনের অভিযোগ


গণপূর্ত অধিদপ্তর রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। কিন্তু এই সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে পাওয়া নথি, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও অডিট রিপোর্ট বিশ্লেষণে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল অনিয়ম নয়, বরং একটি সুসংগঠিত, পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের ভয়াবহ নজির স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন হলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ভিতর ন্যূনতম অনুশোচনা ও নীতিগত কোন পরিবর্তন অদ্যাবধি হয়নি। বছরের জুন মাস আসতে না আসতেই কেনাকাটা ও দরপত্র শিডিউলের সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের পোয়াবারো হতে থাকে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কাছে এই সময়টা হচ্ছে মধু মাস। বিভিন্ন পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাদের আমদানিকৃত অথবা উৎপাদনকৃত পণ্য যা গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয় তা তালিকাভুক্ত করার জন্য ক্রয় কমিটির কর্মকর্তাদের দ্বারস্থ হয়ে থাকে।

চলতি অর্থবছরে জুন মাসের সিডিউল অনুমোদন করানোর জন্য এমনই একটি অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তর ও গণমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। সূত্র মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম শাখার কেনাকাটা সংক্রান্ত ক্রয় কমিটিতে তিনজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। তারা হচ্ছেন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদ্বয় মোঃ আলমগীর খান ও আশরাফুল হক এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র মন্ডল।

একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রমতে, ঢাকার একটি পুরনো লিফট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাদের লিফট গণপূর্ত অধিদপ্তরে অন্তর্ভুক্তির জন্য ক্রয় কমিটির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। এসময় তাদের আমদানিকৃত লিফট ব্যবহারের উদ্দেশ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরে তদবিরের জন্য আরমান ও তৌহিদ নামে দুই ব্যক্তিকে তাদের প্রতিনিধি নিয়োগ করে। এনিয়ে অন্যান্য লিফট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে চাঁপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

উল্লেখ্য যে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে নিম্নমানের পণ্য অন্তর্ভুক্তি এবারই নতুন নয়। এই অধিদপ্তরের প্রতিটি দরপত্রের কার্যাদেশেই সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীগন পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে কোটি কোটি টাকার উৎকোচ গ্রহণ করে থাকেন। এদের সম্পদের পাহাড় গড়ে দেয় এই অসৎ সরবরাহকারী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার নিম্নমানের পণ্য উচ্চমূল্যে ক্রয় করে থাকেন গনপূর্তের প্রকৌশলীরা। তাদের এই অনিয়মের খেসারত দিতে হয় সরকারকে আর জনগণও দোষারোপ করে সরকারকেই। প্রকল্প পরিচালক সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীগন নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে অবৈধ টাকায় বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাটসহ নামে বেনাম সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন।

অতি সম্প্রতি, দেশব্যাপী আলোচিত সংসদ ভবনে নিম্নমানের সাউন্ড সিস্টেমের সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর সারাদেশে গণপূর্তের কর্মকর্তাদের সম্পর্কে জনমনে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সংসদ ভবনের বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়ম এর সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের এখনও আইনের আওতায় আনা হয়নি। সংসদ ভবনের মতো এমন সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর স্থানেই যারা দুর্নীতি করতে পারে তারা অন্যান্য ক্ষেত্রে কি করতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। এই বিষয়ে অভিযুক্ত ৩ প্রকৌশলীর আমলনামা নিম্নে তুলে ধরা হলো।

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক

লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতাধর ও দাপুটে কর্মকর্তা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকের নেতৃত্বে গণপূর্ত অধিদপ্তরে চলছে দুনীতির মহোৎসব। সূত্রমতে, গনপুর্ত অধিদপ্তরের (ই/এম) ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে অবৈধভাবে পদোন্নতি ও কমিশন বানিজ্যের এক বিশাল সাম্রাজ্য।

গনপুর্তের দুনীতির এই বরপুত্র আশরাফুল হকের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে সরকারের সকল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। পতিত আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তা এখনও বহাল তবিয়তে থেকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গনপুর্ত অধিদপ্তরে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নীরব ভুমিকা এখন প্রশ্নবিদ্ধ সাধারণ কর্মকর্তাদের কাছে।

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো; তিনি গণপূর্তের পদোন্নতি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গনপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অবৈধ তদবিরে প্রধান প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে আশরাফুল হক অবৈধভাবে 'তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী' পদে পদোন্নতির জন্য ১১ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করেন। পরে, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে পদোন্নতির নামে মোটা অংকের ঘুষ বানিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছেন। এই বিষয়ে দ্য ফিন্যান্স টুডের একটি চৌকস টীম প্রাথমিক অনুসন্ধান করছে৷ উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ প্রাপ্তি সাপেক্ষে এনিয়ে বিস্তারিত পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।

এদিকে, আশরাফুল হক বিগত সময়ে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও বহাল তবিয়তেই ঘুষ বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন দেদারসে।

অভিযোগ রয়েছে যে, আশরাফুল হক এবং ঠিকাদার সাইদুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত একটি সিন্ডিকেট ই/এম শাখায় টেন্ডার ও পদোন্নতি বাণিজ্য পরিচালনা করছেন। ২০২০ সালে আশরাফুল হকের বিরুদ্ধে  অবৈধ সম্পদ অর্জন, ত্রুটিপুর্ন কাজের বিপরীতে ঠিকাদারদের সাথে আঁতাত করে কমিশন বানিজ্যসহ নানাবিধি অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানপ্রাপ্ত হলেও অদৃশ্য শক্তি এবং অবৈধ ক্ষমতার দাপটে সেই তদন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়।

২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আশরাফুল হক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বঙ্গভবনে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও এর কোনটিই তদন্ত করা হয়নি। পরে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালে সংসদ ভবনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন দাপটের সাথে। লীগ সরকারের আমলে সংসদে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে তাকে সরিয়ে সমীরণ মিস্ত্রিকে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়।

সূত্র মতে৷ আশরাফুল হক যখনই যেকোনও ওয়ার্কিং ডিভিশনে দায়িত্ব পেয়েছেন তখনি শুরু করেছেন লুটপাট। এমনকি গণপূর্ত বিভাগে থাকাকালীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে গণপূর্তের শিডিউলভুক্ত করতে নিয়েছেন বিপুল অংকের অর্থ। দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী আশরাফুল হক দুই ছেলেকে কানাডা পাঠিয়ে নিয়মিত ডলার পাচার করছেন বলে অভিযোগ আছে।

একাধিক সূত্রে আরও জানা গেছ, টেন্ডার প্রতি ২ শতাংশ হারে এবং টেন্ডারে ভুল ধরে ৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা নিয়ে অবৈধভাবে ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেয়ার মাস্টারমাইন্ড এই দুনীতিবাজ আশরাফুল হক। গভীর জলের মাছ আশরাফুল হক শেখ মুজিবের সমাধির সকল বৈদ্যুতিক কাজের পরিকল্পনা করে দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করতে। সাবেক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। বিগত স্বৈরাচারী পতিত লীগ সরকারের আমলে গণপূর্ত অধিদপ্তরে তার বিরুদ্ধে অনেকেরই গুরুতর অভিযোগ থাকলেও কেউ ভয়ে মুখ খোলার সাহস পায়নি।

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খান

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনস্থ গণপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউডি) ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খানের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, অবৈধ সম্পদ অর্জন, টেন্ডার বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি ই/এম বিভাগ-৬ ও ৮-এ নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন ভুয়া নিয়োগ ও জাল বেতনের মাধ্যমে কোটি টাকা লোপাট করেছেন এবং বর্তমানে মেকানিক্যাল শাখায় প্রভাবশালী ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত বলে জানা গেছে।

একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ই/এম বিভাগ-৮ এ সরকারি মালিকানাধীন মাত্র দুটি গাড়ি কার্যকর অবস্থায় রয়েছে। অথচ সরকারি নথিতে নিয়মিতভাবে ৩১ জন চালকের বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হচ্ছে। শুধু এই একটি খাতেই বছরে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এসব তথাকথিত চালকের কোনো বাস্তব উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ নামই কাগজে-কলমে সৃষ্টি করা। অর্থাৎ, ভুয়া নিয়োগ দেখিয়ে নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ উত্তোলন করে সেই অর্থ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খানের পকেটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, এই বিভাগের অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী পর্যাপ্ত স্থায়ী জনবল থাকার পরও নিয়মবহির্ভূতভাবে দৈনিক মজুরি, চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী জনবল দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল তোলা হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির চক্র। এখানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আলমগীর খানের নেতৃত্বে কর্মকর্তা-কর্মচারী, হিসাব শাখা এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই এই লুটপাট চলছে।

এছাড়াও, ২০১৬ সালের জুন মাসে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে একই ঠিকাদারকে একাধিক কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দিতে পারে এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগকে জোরালো করে।

তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী এই প্রকল্পে ৩টি ১৬-চ্যানেল ডিভিআর, ১২টি পিটিজেড ক্যামেরা, ১০টি ডে-নাইট ক্যামেরা ও মনিটর স্থাপনের কথা ছিল বাস্তবে অনেক ক্যামেরা অকেজো বা স্থাপনই হয়নি তবুও কাজ সম্পন্ন না করেই প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সরকারি আর্থিক বিধিমালা লঙ্ঘনের শামিল।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত একাধিক অডিট রিপোর্টে এসব আর্থিক অসঙ্গতি, অযৌক্তিক ব্যয় ও নথিভিত্তিক গরমিল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবুও রহস্যজনক কারণে এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো কার্যকর তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খানের নামে রাজধানীর ধানমণ্ডি ও সেগুনবাগিচায় একাধিক ফ্ল্যাট, পূর্বাচল ৩০০ ফিটে ৩০-৪০ কাঠা জমি এবং রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি আলীশান বাড়ি রয়েছে৷ এছাড়াও তার বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এনিয়ে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র অনুসন্ধান চলমান আছে।

বর্তমানে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে যে, গনপূর্তের ধূর্ত এই কর্মকর্তার উপর দুর্নীতির ছাতাটি কারা ধরে রেখেছে? কেন বারবার অডিট আপত্তি উপেক্ষা করা হচ্ছে? এবং কার স্বার্থে এই লুটপাট ব্যবস্থা বহাল রয়েছে?

বিশ্লেষকদের মতে, গণপূর্ত বিভাগের একটি প্রভাবশালী অংশ কার্যত জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে চলে গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

এই বিষয়ে অভিযুক্ত ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খানের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই বিষয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভুয়া চালক সাজিয়ে যদি বেতনের টাকা উউত্তোলন করেন তবে সেটিও দুর্নীতির মধ্যে পরে। এই ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দেওয়া উচিত।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র মন্ডল

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস-এর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী তথ্যানুযায়ী, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। 

বিসিএস ২৪ তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা ২০০৫ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। চাকুরীতে যোগদানের পর থেকেই নীতিভ্রষ্ট হয়ে টাকা উপার্জনের নেশায় দুর্নীতির বরপুত্র বনে যান। সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর ইমামের (এইচ টি ইমামের পুত্র) রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে 'প্রাইজ পোস্টিং' বাগিয়ে নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র মতে, শেখ চন্দ্র বিশ্বাস ২০১৮ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত বিভাগের ই/এম উড ওয়ার্কশপ বিভাগে কর্মরত অবস্থায় সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণের জন্য ছুটি নিয়েছিলেন। মূলত ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নিশি রাতের নির্বাচনের আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর ক্ষমতায় আসবে না ভেবে নিজের অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করার জন্যই এই ছুটি নিয়েছিলেন তিনি।

পরবর্তীতে নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে শেখর চন্দ্র বিশ্বাস দেশে ফিরে দুর্নীতিবাজ সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার, গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন ও তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমকে ম্যানেজ করে গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পোস্টিং বাগিয়ে নেন।

গোপালগঞ্জে থাকাবস্থায় স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে খুশি করতে শেখর চন্দ্র বিশ্বাস স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজ উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু গ্যালারি তৈরি করেন। আওয়ামী লীগের অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ শেখ সেলিম তার এই উদ্যোগে খুশি হয়ে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর কাছে সুপারিশ করে শেখর চন্দ্র বিশ্বাসকে ২০২১ সালের ৭ই জানুয়ারি 'তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী' পদে পদোন্নতি বাগিয়ে দেন।

শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাতেও বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের গুঞ্জন রয়েছে। এছাড়া, কলকাতার রাজারহাট নিউ টাউন এলাকায় তার একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণের তথ্য পাওয়া গেছে।

শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের নামে ঢাকার মোহাম্মদপুরের মোহাম্মাদিয়া হাউজিং সোসাইটির ৯নং রোডের ৫/৭ নং এ কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত  আলিশান বাড়ি এবং মালিবাগ, ধানমন্ডি এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিলাসবহুল ৫টি ফ্ল্যাট এবং বাড়ি রয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এনিয়ে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র অনুসন্ধান চলমান আছে।

শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এতসব অভিযোগ থাকলেও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে ধীরগতির কারণে তিনি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

পরিশেষে, এই কথা বলাই বাহুল্য যে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যে কয়েকজন প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী রয়েছেন, তাদের মধ্যে আশরাফুল হক, মো: আলমগীর খান এবং শেখর চন্দ্র বিশ্বাস অন্যতম।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.