বিশেষ প্রতিবেদক
Published:2026-05-21 02:54:35 BdST
রিজার্ভ চুরির পর দ্বিতীয় বৃহৎ ডিজিটাল ডাকাতি!কর্ণফুলী টোলপ্লাজায় ‘রেগনাম’-এর শত শত কোটি টাকার টোল কেলেঙ্কারি
দেশের ইতিহাসে আবারও তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা এবার হাতেনাতে ধরা পড়েছে।কোটি কোটি মানুষের চোখের সামনে, সবার অজান্তেই চলছে এক অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি; আর এর মূল আখড়া হয়ে উঠেছে দেশের ব্যস্ততম টোল প্লাজাগুলো!
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এই ভয়ংকর লুটপাটের কেন্দ্রে রয়েছে বিতর্কিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান— ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’।টোল আদায়ের জন্য সরকারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো চুক্তি নেই। রীতিমতো গায়ের জোরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কর্ণফুলী ব্রিজসহ দেশের অন্তত এক ডজন ব্যস্ততম টোল প্লাজাকে নিজ প্রতিষ্ঠানের অবৈধ অর্থ আয়ের হাতিয়ার বানিয়েছে তারা।
দ্য ফিন্যান্স টুডের বিশেষ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড অত্যাধুনিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ও টোল আদায়ের আড়ালে ভুয়া ও এডিট করা রিপোর্টিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে সরকারের রাজস্বের বড় অংশ আত্মসাৎ করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ আশীর্বাদ ও যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটি এই টোল প্লাজাগুলোর একক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) সিস্টেম ও ডাটাবেজে ম্যানিপুলেশন চালিয়ে সরকারের শত শত কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। তাদের জালিয়াতির ধরন শুনে বিশ্লেষকরাও চমকে উঠে বলছেন, এ যেন দিনে-দুপুরে ডাকাতি!
সূত্রমতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ‘ঘনিষ্ঠজন’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ হোসাইন জনির প্রতিষ্ঠান ‘রেগনাম রিসোর্সেস লি:’। সরকারি ক্রয়-নীতিমালা (পিপিআর) অমান্য করে দরপত্র ছাড়াই কোনও ধরনের যাচাই-বাছাই ব্যতীত মৌখিকভাবে তাকে মেঘনা-গোমতী সেতুসহ অনেক সেতুর টোল আদায়ের ‘কার্যাদেশ’ দেয়া হয়।
জুলাই বিপ্লবের পর হাসিনা পালিয়ে গেলেও প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে আওয়ামী নেতারা অবৈধভাবে নিজেদের কোম্পানির মাধ্যমে টোল আদায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে। এসবের কয়েকটি হচ্ছে, সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ‘কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস), ওবায়দুল কাদেরের ‘ঘনিষ্ঠজন’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ হোসাইন জনির ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিডেট’, আমিনুল হক শামীমের ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ, মোহাম্মদ কালাম হোসেনের মালিকানাধীন ‘ইউডিসি কোম্পানি লি:’, আওয়ামীপন্থী শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক ও প্রকৌশলী মেহবুব কবিরের মালিকানাধীন ‘এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজি লিমিটেড (এটিটি)’ এবং হাসিনার পালিত কসাইখ্যাত (বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় বিচারের মুখোমুখি) জিয়াউল আহসানের ‘পেন্টা গ্লোবাল’।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোই ঘুরেফিরে দেশের ৬৭টি টোলপ্লাজা এবং সড়ক থেকে টোল কালেকশন কব্জায় রেখেছে। এর মধ্যে, আনিসুল হক এবং জিয়াউল আহসানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারের টোল বাবদ প্রাপ্য শত শত কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে। তবে এই প্রক্রিয়ার ব্যতিক্রম হচ্ছে ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’।
নিখুঁত হরিলুট!
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আজম ও শামীম ওসমানের সরাসরি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রেগনামের মালিক মোহাম্মদ হোসেন জনি লুটপাটের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। সরকার পরিবর্তন হলেও মোহাম্মদ হোসেন জনির ডিজিটাল টোল চুরির কোনো পরিবর্তন নেই। কোথায়, কীভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই খবর সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের নেই।
জানা গেছে, সড়ক ও সেতু দফতরের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে হাত করে রেগনাম চুরি করছে এই অর্থ। প্রক্রিয়াটির সঙ্গে পদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা সম্পৃক্ত থাকায় রেগনামের মতো প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই নির্বিঘ্নে শত শত কোটি টাকার টোল চুরির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) সিস্টেমের আওতায় বেসরকারি টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’ তাদের নিজস্ব ‘ইউনিফাইড টোল সিস্টেম’ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) সিস্টেমের আওতায় শুধু মেঘনা-গোমতী টোলপ্লাজাই নয়, দেশের অন্তত ৬৭টি সেতুর অধিকাংশেরই টোল আদায় করছে।
টোল আদায়ের পরপরই রেগনামের অপারেটররা একটি অননুমোদিত ‘সেকেন্ডারি সার্ভার’ ব্যবহার করে অবৈধভাবে মূল ডাটাবেজে ঢুকে গাড়ি পারাপারের আসল রেকর্ড এবং সিসিটিভি ফুটেজ চিরতরে মুছে দিচ্ছে!
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ৭ মে রাত ১টা থেকে ১টা ১০ মিনিটের মধ্যে কর্ণফুলী ব্রিজ পার হয়েছিল ১৩টি গাড়ি। অথচ এর মধ্যে ৯টি গাড়িরই টোল ট্রানজেকশন মূল সার্ভারের ডাটাবেজ থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে! অর্থাৎ, মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে একটিমাত্র পয়েন্ট থেকেই গায়েব হয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাষ্ট্রীয় রাজস্ব।
এটি তো কেবল কর্ণফুলী ব্রীজের ঘটনা। ভৈরব, আত্রাই, নরসিংদীর চরসিন্দুর ও নাটোরের বনপাড়াসহ দেশের অন্তত ডজনখানেক টোল প্লাজাকে বছরের পর বছর ধরে গিলে খাচ্ছে রেগনামের এই অবৈধ নেটওয়ার্ক।
এরও আগে, চলতি বছরের ১৭ মার্চ মেঘনা-গোমতী সেতু টোলপ্লাজার ৩ নম্বর লেনটির ক্যামেরা বন্ধ রেখে শত শত গাড়ির টোল আদায় করে ‘রেগনাম রিসোর্স লি:’। টোলপ্লাজা অতিক্রমকৃত বহু গাড়িরই ভেহিকেল রেজিস্ট্রেশন নম্বর (ভিআরএন), ভেহিকেল টাইপ (গাড়ির ধরন), গাড়ির সংখ্যা, লেনওয়ারি গাড়ির ইমেজ, ফুটেজ রয়েছে। অথচ নেই কোনো ট্রানজেকশন নম্বর। ওই দিন বেলা ১২টা ১০ মিনিট থেকে ১টা ৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের মধ্যে ৩২টি গাড়ি টোলপ্লাজা অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে মাত্র ১২টি গাড়ির থেকে টোল আদায় করা হয়েছে। ২০টি গাড়ির টোল আদায়ের কোনো ট্রানজেকশন নম্বর ইউটিসিএস রেকর্ডে নেই। অর্থাৎ মুছে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ নম্বর লেনে (সিরিয়াল নম্বর ১ ও ২) ‘আন-রেজিস্ট্রার্ড’ (টিএক্সএন-৭৯৪৬১৮, ৭৯৪৬১৯) দুটি টেম্পো (ইমেজ নং-৯০৯৩২০২৬০৩১১৭০০৯৫৬৪৪, ৯০৯৩২০২৬০৩১১৭০০৯৫৬৪৮) ১৫ টাকা করে টোল আদায় করা হয়। সিরিয়াল নং-
৩ নং সিরিয়ালে (টিএক্সএন-৭৯৪৬২০) মিডিয়াম ট্রাক (ভেহিকেল রেজিস্ট্রেশন নং-গাজীপুর-ম-১১-০০৪৮) থেকে ১৫০ টাকা টোল আদায় করা হয়েছে। (ইমেজ নং-লেন-৩ ৯০৯৩২০২৬০৩১১৭০০৯৫৬৪৭)। এর পরপরই দেখা যায়, বেলা ১২টা ১০ থেকে ১২টা ১০ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের মধ্যে ৮টি গাড়ি থেকে ১০০৯ টাকা করে টোল আদায় করেছে (মোট ৭০৬৩ টাকা)। ১২টা ১৮ মিনিট ১০ সেকেন্ড থেকে ১টা ৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ড পর্যন্ত ১৩টি গাড়ি থেকে ৪৩৫ টাকা করে (মোট-৫৬৫৫ টাকা) টোল আদায় করা হয়েছে। সেগুলোর ইমেজ থাকলেও ট্রানজেকশন রেকর্ড মুছে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৫৩ মিনিটের মধ্যে আদায়কৃত টোল থেকে রেগনাম ১২ হাজার ৭১৮ টাকা ‘নাই’ করে দিয়েছে।
কোম্পানির রহস্য
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, ‘রেগনাম রিসোর্সেস লি:-এর জয়েন্ট স্টকে নিবন্ধিত একটি কোম্পানি বটে। তবে এটি মোহাম্মদ হোসেন জনির মালিকানাধীন একটি বেনামি প্রতিষ্ঠান। রেকর্ডপত্রে কখনো প্রতিষ্ঠানটির ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ দেখানো হয়েছে স্ত্রী শাহনাজ বেগম মিতুকে। কখনো তাকে রাখা হয়েছে রেগনামের ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে। যেখানে শাহনাজ বেগম মিতু এটির ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ সেখানে মোহাম্মদ হোসেন জনির নাম উল্লেখ রয়েছে ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে। আর যেখানে স্ত্রী ‘চেয়ারম্যান’ সেখানে মোহাম্মদ হোসেন জনি নিজেকে দাবি করেছেন ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’।
তবে প্রতিটি সংশোধনীতে ছেলে সাদমান সাকিফকে রাখা হয়েছে ‘ডিরেক্টর’ হিসেবে। নিবন্ধিত ‘রেগনাম রিসোর্স লিমিটেড’-এর ঠিকানা দেখানো হয়েছে, ‘রহমানস রেগনাম সেন্টার’, ১৯১/বি, তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোড, ঢাকা-১২০৮। যাতে শাহনাজ বেগম মিতুর টিআইএন নম্বর-০৭৭-১০৬-৬২৬১, সার্কেল-২৩ উল্লেখ রযেছে। তার এনআইডি নম্বর: ২৬১১৮৮৪৫৩৫৭৬৭। পেশা উল্লেখ করা হয়েছে ‘ব্যবসায়ী’।
রেগনামের ১৫ হাজার শেয়ারের মধ্যে ৯ হাজার শেয়ার রয়েছে শাহনাজ বেগম মিতুর নামে। পুত্র সাদমান সাকিফের রয়েছে ছয় হাজার শেয়ার। সাদমানের টিআইএন নম্বর-০৭৭-১১০-৪৯৭৫। করাঞ্চল-২৩। তার কোনো এনআইডি নেই। পাসপোর্ট নম্বর-কিউ-০১৫১৪৯২। মোহাম্মদ হোসেন জনির ছেলের সাদমান সাকিফের ‘পেশা’র ঘরটি ফাঁকা। প্রতিষ্ঠানটির অথোরাইজ ক্যাপিটাল ধরা হয়েছে তিন কোটি টাকা। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- সর্বত্রই মোহাম্মদ হোসেন জনির টিআইএন নম্বর, ফোন নম্বর, এনআইডি নম্বর গোপন রাখা হয়েছে।
‘রেগনাম রিসোর্স লিমিটেড’-এর অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ হোসেন জনির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কোনো জবাব মিলেনি।
সরকারের করনীয়
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলেন, রেগনাম রিসোর্স এমন নিখুঁতভাবে টোলের টাকা চুরি করেছে যে, আইটি জ্ঞানসম্পন্ন ক্রেডিবল কোনো অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করালেই কেবল রেগনামের অর্থ চুরির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ সম্ভব।
তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, এই ভয়ংকর অপরাধ এখনই রুখতে হবে। এর জন্য টোল প্লাজার লোকাল নেটওয়ার্কে বহিরাগত সব ধরনের ভিপিএন সংযোগ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং সিসিটিভি ফুটেজের রেকর্ডের সাথে মূল সার্ভারের ট্রানজেকশনগুলো কঠোর অডিটের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে এভাবেই পাচার হতে থাকবে জনগণের কষ্টের টাকা।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
