April 23, 2026, 4:26 pm


শাহীন আবদুল বারী

Published:
2026-04-23 11:28:03 BdST

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত


দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ বাহিনীকে কড়া নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকান্ড সহ বিভিন্ন অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। পুলিশের শীর্ষ কর্তারা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। বৈঠকে থানা পুলিশের টহল টিমের কর্মকান্ড নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিশেষ বৈঠক করে বেশকিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরই মধ্যে পুলিশের সবকটি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের বার্তা পাঠানো হয়েছে।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিএমপি সহ যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হবে সেখানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাৎক্ষণিক বদলিসহ সাময়িক বরখাস্তও করা হতে পারে। পুলিশের একটি সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন, প্রতিটি এলাকায় থানা পুলিশের ঢিলেঢালা টহল হচ্ছে। রাতের বেলায় ডিউটি হয় না বললেই চলে। আবার কিছু টহল হলেও গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে রাত পার করে দেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। আন্ডারওয়ার্ল্ড আগের চেয়ে বেশি তৎপর হচ্ছে। রাজনৈতিক বিরোধ বাড়ছে। টার্গেট করে হত্যাকান্ড ঘটানো হচ্ছে। চরমপন্থিদের অপকর্মও বেড়ে গেছে। অনেক অপরাধী ভাড়ায় খাটছে। দেশের ভেতরের পাশাপাশি বিদেশ থেকে হত্যার নির্দেশনা আসছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও আছে আতঙ্ক। চলমান পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকার নির্দেশ দিলেও পুলিশের মধ্যে ঢিলেঢালা ভাব দেখা যাচ্ছে। উদ্ধার হচ্ছে না সরকারি লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র। ধরা পড়ছে না দাগি অপরাধী। তাই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদরদপ্তরে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। গত সোমবার বৈঠক শেষে পুলিশের সব ইউনিটকে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। টার্গেট কিলিংয়ের তালিকায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি নেতা, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ আছে বলে গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিদিনই খুনখারাবি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সারাদেশে অন্তত ২০ জন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। ছিনতাইয়ের ঘটনা তো দিনের বেলাতেই হচ্ছে। সবমিলিয়ে আমরাও আছি উদ্বেগের মধ্যে।

তিনি বলেন, আমরা বেশকিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা অবনতি হবে, সেখানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। শাাস্তির মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস, বদলি ও সাময়িক বরখাস্ত রয়েছে। এরই মধ্যে সবাইকে কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে। কোনো ধরনের ছাড় পাবে না কেউ।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার পেছনে রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের অনেক নেতা। তাদের উদ্দেশ্য দেশজুড়ে চাঞ্চল্য ও সমাজে ভীতি-আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা। তারা দেশে অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলানোর চেষ্টা করছে। বিদেশে বসে অনেক আওয়ামী নেতা কলকাঠি নাড়ছে। দেশের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তাদের ইন্ধনে খুন-খারাপি সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।'

পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশজুড়ে পেশাদার অপরাধীদের তালিকা করে এখনই আইনের আওতায় নেয়া জরুরি। জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। আটকের এক মাসের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পাচ্ছে অপরাধীরা। এই কারণে অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। আর এই সুযোগে এসব অপরাধীকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কাছে টানছে কোনো কোনো মহল।

প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এরই মধ্যে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক গোপন বার্তায় অপরাধীদের তালিকা করে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জেলায় জেলায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বসানো হয়েছে বাড়তি তল্লাশি চৌকি। কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। সাদা পোশাকের গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

অপরাধীরা বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের টার্গেট করে খুন করছে। বিকেলের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যেসব এলাকায় টহল জোরদার থাকার কথা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকাগুলোয় পুলিশের গাড়ি শুধু মূল সড়কে সীমাবদ্ধ থাকছে, গলি বা সরু রাস্তায় পুলিশের প্রবেশ কমে গেছে। এই সুযোগে স্থানীয় অপরাধী চক্র ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ছে। এখনো পর্যন্ত ১ হাজার ৩২৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।

ঢাকাসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাই, ডাকাতি, হামলা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক কারবারিরাও বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

পুলিশের সাবেক একজন আইজিপি বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলেই অপরাধী চক্রগুলো সুযোগ নিচ্ছে। আবার নতুন করে বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়ার ভয়েও অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছেন অনেক পুলিশ সদস্য। এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কোনো এলাকায় যদি টহল পুলিশের অবহেলার কারণে চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটে, তবে শুধু মাঠপর্যায়ের কনস্টেবল নয়, সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং সার্কেল এসপিকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনা দরকার।

সাবেক এই আইজিপি বলেন, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বা পেশাদারিত্বের ঘাটতি প্রমাণিত হলে বিভাগীয় মামলাসহ তাৎক্ষণিক ক্লোজড (প্রত্যাহার) করার নির্দেশ দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে অপরাধ পর্যালোচনার মাধ্যমে থানাভিত্তিক র‌্যাঙ্কিং করা হবে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা শাখা (ইন্টেলিজেন্স) টহল দলের কার্যক্রম নজরদারি করতে হবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নতি করতে বেশ কিছু নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। এলাকায় পুলিশের টহল বৃদ্ধি করতে বলা হয়েছে। থানায় জনবল বা যানবাহন সংকট থাকলে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। দাগি সন্ত্রাসীসহ অন্যান্য অপরাধীদের আটকে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্লকরেইড দিয়ে অপরাধীদের নির্মূল করতে হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেয়া হবে না। এমনকি পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ মিললে কঠোর শাস্তির আওতায় নেয়া হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি প্রতিরোধ করতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার সবার আগে ঠেকাতে হবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো যেন শীর্ষপর্যায়ের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় না দেয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।’

ডিএমপির কয়েকটি থানার ওসিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশ বাহিনীর মধ্যেও অনেক ভয়ভীতি কাজ করে। কারণ অপরাধীদের আশ্রয়দাতা কোনও না কোন দলের নেতা। অনেক সময় তারা থানা পুলিশকে ম্যানেজ করতে না পেরে বড় স্যারদের কাছে ফোন করে মিথ্যা অপবাদ বা অভিযোগ দেয়। এছাড়া মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে অনেক রাজনৈতিক নেতা জড়িত। আবার দেখা গেছে, কোন অপরাধীকে ধরে চালান দিলে দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসে। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করলে অপরাধীরা সহসাই জামিন পাবে না। তাতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে সহজ হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ওসি জানান, পতিত সরকারের আমলে অনেক সুবিধাভোগী পুলিশ সদস্য রয়েছে, তারাও ডিউটিতে নানাভাবে ফাঁকি দিচ্ছে কিনা সেই বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো দরকার।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারাদেশে ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে ৩১৭টি। গড়ে প্রতি মাসে খুনের ঘটনা ২৮৪টি। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে খুনের ঘটনা ছিল ৭৫০টি। জানুয়ারিতে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ২১৭ ও মার্চে ২৩৯ জন খুন হয়। গত বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২৫০টি। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ৭১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২৩১টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৪০ ও মার্চেত ২৩৯টি। ওই বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে হত্যার ঘটনা ২৩৬টি।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.