বিশেষ প্রতিবেদক
Published:2026-04-30 13:11:58 BdST
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে সংকটের নগ্নচিত্রউচ্চশিক্ষা নাকি সনদ কারখানা?
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর নাম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও শহরজুড়ে এর অধিভুক্ত হাজারো কলেজে লাখো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। কিন্তু বিশাল এই কাঠামোর আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে জমে উঠেছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মান নিয়ে বহু গুরুতর প্রশ্ন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—কাগজে-কলমে ক্লাস রুটিন থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কলেজে নিয়মিত ক্লাস হয় না। শিক্ষক সংকট ও তদারকির অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম অনেকটাই দায়সারা পর্যায়ে নেমে এসেছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে সাধারণত সপ্তাহে ৫ থেকে ৬ দিনের ক্লাস রুটিন প্রকাশ করা হয়। রুটিন দেখে মনে হয় পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক কার্যক্রম চলছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষার্থীদের দাবি, সপ্তাহে যেখানে ১৫-২০টি ক্লাস হওয়ার কথা, সেখানে বাস্তবে হয়তো ৩-৪টি ক্লাস হয়; কখনও কখনও সপ্তাহে মাত্র ১-২ দিন শিক্ষক উপস্থিত থাকেন।
রাজধানীর একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত কলেজের অনার্স শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“ভর্তি ফি, সেশন চার্জ, ফরম ফিলাপ, কেন্দ্র ফি—সবকিছু সময়মতো দিতে হয়। একদিন দেরি হলেই জরিমানা। কিন্তু ক্লাস না হলে, শিক্ষক না এলে বা কোর্স শেষ না হলে আমাদের কথা শোনার কেউ নেই।”
আরেক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, “পুরো বছর ক্লাস ঠিকমতো হয় না। সিলেবাস শেষ হয় না। পরীক্ষার আগে কিছু সাজেশন আর শর্ট নোট ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়—এগুলো পড়লেই হবে।”
শুধু ক্লাস না হওয়াই নয়, অনেক কলেজে শিক্ষক উপস্থিতির ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের শৈথিল্য। অভিযোগ রয়েছে, কিছু শিক্ষক একাধিক প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ত থাকায় নিয়মিত ক্লাস নিতে পারেন না। আবার কোথাও শিক্ষক সংকট এতটাই প্রকট যে একটি বিভাগের একাধিক কোর্স পরিচালনা করেন মাত্র ১ বা ২ জন শিক্ষক। এতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত কলেজগুলোর বড় অংশে “পরীক্ষা-কেন্দ্রিক শিক্ষা সংস্কৃতি” গড়ে উঠেছে। এখানে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানচর্চা নয়, বরং যেকোনোভাবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। গবেষণা, সেমিনার, প্রেজেন্টেশন, ল্যাবভিত্তিক শিক্ষা বা দক্ষতা উন্নয়নের মতো আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা অধিকাংশ কলেজেই অনুপস্থিত।
একজন শিক্ষা গবেষক বলেন, “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সংকট হলো মনিটরিং। এত বিপুল সংখ্যক কলেজকে কার্যকরভাবে তদারকি করার সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে, অধিভুক্ত কলেজগুলো অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের মতো করেই চলছে।”
আর্থিক অনিয়ম
শিক্ষার্থীদের আরেকটি বড় অভিযোগ আর্থিক অনিয়ম নিয়ে। ভর্তি, ফরম ফিলাপ, সনদ উত্তোলন, ব্যবহারিক পরীক্ষা, কেন্দ্র ফি—বিভিন্ন খাতে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। বিশেষ করে পরীক্ষার ফরম ফিলাপ ও অ্যাডমিট কার্ড বিতরণের সময় অনেক কলেজে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক শিক্ষার্থী জানান, অনার্স ও ডিগ্রি পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড বিতরণের সময় নির্ধারিত ফির বাইরে ৫০০, ৭০০, এমনকি ৮০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। এর কোনো লিখিত রসিদও অনেক সময় দেওয়া হয় না।
এক শিক্ষার্থী বলেন, “অ্যাডমিট নিতে গিয়ে বলা হয় কলেজ ডেভেলপমেন্ট ফি, সিটিং চার্জ, মেইনটেন্যান্স ফি—এমন নানা নামে টাকা দিতে হবে। না দিলে অ্যাডমিট আটকে রাখে।”
এই ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। বছরের পর বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত বহু কলেজে একই ধরনের আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়।
সেশন জট
শুধু তাই নয়, সেশনজট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের এক বড় সমস্যা। নির্ধারিত সময়ে ভর্তি, ক্লাস, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশে পিছিয়ে পড়েন। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেশনজট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবুও একাডেমিক মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর মানোন্নয়নে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন— নিয়মিত ক্লাস মনিটরিং, শিক্ষক উপস্থিতির ডিজিটাল ট্র্যাকিং, শিক্ষার্থী অভিযোগ গ্রহণের স্বচ্ছ প্ল্যাটফর্ম, অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধে অডিট ব্যবস্থা এবং কলেজভিত্তিক একাডেমিক মূল্যায়ন।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা শুধু ডিগ্রি নয়, মানসম্মত শিক্ষা চান। কাগজে রুটিন আর বাস্তবে ফাঁকা শ্রেণিকক্ষ দিয়ে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বিশাল অংশ যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়নির্ভর, তখন এই খাতের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা শুধু কয়েকটি কলেজের সমস্যা নয়; এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। কাগজে-কলমে শিক্ষা নয়, বাস্তবভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থাই এখন শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি।
শিক্ষক সংকট
দেশের বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা কাঠামো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধিভুক্ত কলেজগুলোতে শুধু ক্লাস সংকট নয়, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক স্বল্পতা, দুর্বল অবকাঠামো এবং সেশনজট শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাখো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হলেও বাস্তবে তারা পড়ছেন সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অপ্রতুল একাডেমিক পরিবেশ এবং অনিশ্চিত সময়সীমার মধ্যে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত বহু কলেজে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। একটি বিভাগে যেখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষক থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে অনেক সময় অর্ধেকেরও কম শিক্ষক দিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম চালানো হয়। ফলে একজন শিক্ষককে একাধিক কোর্স, একাধিক সেমিস্টার, এমনকি কখনও একাধিক বিভাগের দায়িত্ব সামলাতে হয়।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্লাসের সংখ্যা ও মানের ওপর। শিক্ষক না থাকায় অনেক কোর্সে নিয়মিত ক্লাস হয় না, সিলেবাস অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত পরীক্ষামুখী সাজেশননির্ভর প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এক শিক্ষার্থী বলেন, “একজন শিক্ষককে তিন-চারটা কোর্স নিতে হয়। উনি সবকিছু সামলাতে পারেন না, এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষতিটা হচ্ছে আমাদের।”
অবকাঠামো
শুধু শিক্ষক সংকটই নয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতাও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত কলেজগুলোর একটি বড় সংকট। দেশের বিভিন্ন কলেজে এখনো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও অবকাঠামো সেই হারে বাড়েনি। ফলে অনেক কলেজে একই রুমে গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হয়, আবার কোথাও রুম সংকটের কারণে ক্লাসই বাতিল করা হয়।
বিজ্ঞানভিত্তিক বিভাগগুলোতে ল্যাব সুবিধার ঘাটতি আরও প্রকট। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল, আধুনিক ল্যাব সেটআপ—সবকিছুর অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
একজন শিক্ষার্থী বলেন, “ল্যাব আছে, কিন্তু ব্যবহার করার মতো অবস্থা নেই। যন্ত্রপাতি পুরোনো, অনেক কিছু নষ্ট। বাস্তবে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ খুবই কম।”
লাইব্রেরী
লাইব্রেরি ব্যবস্থাও অধিকাংশ কলেজে দুর্বল। প্রয়োজনীয় বই, সাম্প্রতিক জার্নাল বা গবেষণা সামগ্রী পাওয়া যায় না। অনেক লাইব্রেরি শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে আছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ক্ষেত্রেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত কলেজগুলোর বড় অংশ পিছিয়ে। স্মার্ট ক্লাসরুম, মাল্টিমিডিয়া সুবিধা, অনলাইন রিসোর্স, ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম—এসব এখনো অধিকাংশ কলেজে বিলাসিতা। ফলে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে পিছিয়ে পড়ছেন বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই সংকটগুলো মিলিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক ধরনের “সনদনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায়” ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যেখানে দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, গবেষণা বা বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের চেয়ে কেবল ডিগ্রি অর্জনটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও হতাশাজনক সমস্যা হলো সেশনজট। চার বছরের অনার্স কোর্স শেষ করতে বহু শিক্ষার্থীর ৫ থেকে ৬ বছর, কখনও আরও বেশি সময় লেগে যায়।
পরীক্ষা সময়মতো না হওয়া, রুটিন পিছিয়ে যাওয়া, ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের চাকরিতে প্রবেশ, উচ্চশিক্ষার আবেদন এবং ব্যক্তিগত পরিকল্পনা সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে।
অপর এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে কোর্স ৪ বছরে শেষ হওয়ার কথা, সেটা শেষ করতে ৬ বছর চলে যাচ্ছে। চাকরির বয়স চলে যাচ্ছে, পরিবার চাপ দিচ্ছে—এই ক্ষতির দায় কে নেবে?”
অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, একাডেমিক ক্যালেন্ডার থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না। পরীক্ষার রুটিন প্রকাশের পরও নানা কারণে পরীক্ষা পিছিয়ে যায়। আবার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ফল প্রকাশে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সমস্যা হলো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং বিপুলসংখ্যক কলেজ কার্যকরভাবে তদারকির অক্ষমতা। হাজারো কলেজ, লাখো শিক্ষার্থী এবং সীমিত প্রশাসনিক সক্ষমতার কারণে মাঠপর্যায়ে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তাদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন— কলেজভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিক ল্যাব স্থাপন,
লাইব্রেরি ও ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা,
নির্ধারিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে সময়সীমা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ প্ল্যাটফর্ম চালু করা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার প্রধান ভরসা। কিন্তু যদি এই ব্যবস্থার ভেতরে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সেশনজটের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধান না হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষা কেবল সনদ বিতরণের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কা শিক্ষাবিদদের।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন এখন একটাই—শুধু ডিগ্রি নয়, তারা কি কখনও সময়মতো মানসম্মত শিক্ষা পাবে?
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
