May 3, 2026, 6:10 pm


শাহীন আবদুল বারী

Published:
2026-05-03 16:43:02 BdST

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য সাফল্য সত্বেও প্রতিহিংসার শিকারইতিহাস গড়ে ঢাকার প্রথম নারী এসপি শামীমা পারভিন


অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসই গড়লেন শামীমা পারভীন। ঢাকা জেলার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারী পুলিশ সুপার (এসপি) হয়ে নারী জাগরণের গান গাইলেন এই মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তা।নিজের সততা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব, ধৈর্য্য এবং দীর্ঘ ত্যাগ স্বীকারের পর এই সফলতার মুখ দেখলেন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে উপ-সচিব তৌছিফ আহমেদ সাক্ষরিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্তমান পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে বদলি করা হয়েছে।

তবে, ঢাকার নতুন নারী পুলিশ সুপার নিয়োগ নিয়ে নেট দুনিয়ায় এখন বইছে তর্কের ঝড়। কেউ উচ্ছ্বসিত, কেউ প্রশ্ন তুলছেন। কেউ প্রশংসা করছেন, কেউ সমালোচনা করছেন। কিন্তু এই শোরগোলের ভেতরে চাপা পড়ে যাচ্ছে এক মেধাবী নারী পুলিশ কর্মকর্তার দীর্ঘ ১৫ বছরের নীরব বঞ্চনার ইতিহাস—যার গল্পটা পর্দার আড়ালেই থেকে গেছে।

বিসিএস ২৫তম ব্যাচের একজন চৌকস কর্মকর্তা হয়েও শামীমা পারভীনের দেড় দশক ধরে "পর্দার আড়ালে" বা কোণঠাসা থাকার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আদর্শিক ভিন্নতা।

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেন তাকে নিগৃহীত হতে হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে খুব বেশী সময় লাগেনি এই প্রতিবেদকের।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, শামীমা পারভীনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো কেটেছে অদৃশ্য এক চাপের মধ্যে। কারণ, তার রাজনৈতিক পরিচয়। বিএনপি ঘরানার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে আওয়ামী লীগ শাসনামলে তাকে প্রশাসনিকভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল।

শামীমা পারভীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের শীর্ষস্থানীয় নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে কোনো কর্মকর্তার অতীত রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড যদি তাদের আদর্শের সাথে না মিলত, তবে তাকে "অবিশ্বস্ত" হিসেবে গণ্য করা হতো। আর তাঁর স্বামী রকিবুল ইসলাম বকুল বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা। এই একটিমাত্র ‘ট্যাগ’—তার পুরো ক্যারিয়ারের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিলো। তার মেধার ওপর পড়েছিল সরকারের প্রতিহিংসার খড়গ। যোগ্যতা ও সিনিয়রিটি থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর তিনি পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রশাসনের ভেতরে তাঁকে একপ্রকার ‘অচ্ছুত’ করে রাখা হয়েছিল।

শামীমা পারভীনকে বছরের পর বছর পুলিশ সদর দপ্তরের বিভিন্ন ইউনিটগুলোতে এমন সব ডেস্কে রাখা হয়েছিল, যেগুলোকে পুলিশের ভাষায় 'ডাম্পিং পোস্টিং' বলা হয়। একজন মেধাবী ক্যাডার কর্মকর্তার ক্যারিয়ারকে এভাবে স্থবির করে রাখাই ছিল সেই সময়ের প্রশাসনের কৌশলী বঞ্চনা।

যারা আজ নিরপেক্ষতার কথা বলে প্রশ্ন তুলছেন—গত ১৫ বছর তারা কোথায় ছিলেন? যখন মেধাবীদের সরিয়ে রেখে চাটুকারদের জায়গা দেয়া হচ্ছিল, তখন এই ‘নীতিবোধ’ কোথায় ছিল?

যুগে যুগে শামীমা পারভীনদের মতো কর্মকর্তারা প্রমাণ করে আসছেন যে মেধা, ধৈর্য আর সময়—এই তিনটা থাকলে ন্যায়বিচার দেরিতে হলেও আসে।

১৮ বছরের ক্যারিয়ার 

নড়াইল জেলার কৃতি সন্তান শামীমা পারভীন ২৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। এই চৌকস কর্মকর্তা পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি হিসেবে এডুকেশন, স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার (শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া) শাখায় কর্মরত ছিলেন। 

এর আগে, তিনি হাইতিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ১৩৯ জন পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত ফিমেল ফরমড পুলিশ ইউনিটের কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেন। এছাড়া, তিনি ডিএমপির ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারে সহকারী কমিশনার হিসেবে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তিনি আন্তর্জাতিক নারী পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের (আইএডব্লিউপি) সেন্ট্রাল ও দক্ষিণ এশিয়ার কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২২টি দেশের নারী পুলিশের সমন্বয়কের দায়িত্বও সামলেছেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

শামীমা খুলনা-৩ আসনের বিএনপি'র সংসদ সদস্য ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ্ব রকিবুল ইসলাম বকুলের সহধর্মিণী।

সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী, রকিবুল ইসলাম বকুলের ব্যক্তিগত সম্পদের তুলনায় তার স্ত্রী শামীমা পারভীনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ বহুগুণ বেশি বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে কোনঠাসা হয়ে থাকলেও নারীদের পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পদগুলোতে আসার যে পথ সুগম হয়েছিল, শামীমা পারভীন তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। রাজনৈতিক পটভূমি যাই হোক না কেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি প্রমাণ করেছেন যে সততা, দক্ষতা আর পেশাদারিত্ব থাকলে যেকোনো উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব।

ঢাকার প্রথম নারী এসপি হিসেবে শামীমা পারভীনের এই যাত্রা সফল হোক। এটাই সকলের প্রত্যাশা।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.