May 12, 2026, 2:43 pm


শাহীন আবদুল বারী

Published:
2026-05-12 13:04:07 BdST

রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারি কর্মকর্তাদের অপেশাদার আচরণে ক্ষুব্ধ জনগণ


বাংলাদেশে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কিংবা বিভিন্ন কারণে দায়িত্বে থাকা কোন কোন সরকারি কর্মকর্তার আচরণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনাও দেখা যায়।

সম্প্রতি দেশের প্রশাসনিক স্তরে সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশের রূঢ় আচরণ এবং অপেশাদার কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিও এবং মাঠ পর্যায়ের কিছু ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, জনগণের সেবক হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে অশোভন আচরণ করছেন, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এনিয়ে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে।

অভিযোগকারীরা বলেন, সরকারি দফতরগুলোতে বর্তমানে এক ধরণের ‘পেশাদারিত্বের দাপট’ চলছে যেখানে সাধারণ মানুষের আবেগ বা দেশপ্রেমের চেয়ে ক্ষমতার দম্ভ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। অথচ তারা দেখে না আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিভাবে শান্ত, ভদ্র ও নমনীয়তার সাথে সবার সাথে আচারণ করে দেশ পরিচালনা করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ থেকে জানা যায়, এক সরকারি কর্মকর্তার রূঢ় আচরণের শিকার হয়েছেন দীর্ঘদিনের এক দেশপ্রেমিক ও পরোপকারী নাগরিক। অথচ ‘মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে’—এই চিরাচরিত সত্যকে উপেক্ষা করে তুচ্ছ কারণে সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক কর্মকর্তা গরুর হাট নিয়ে বিএনপির এক নেতার সাথে রূঢ় আচরণ করেন। যা দেখে দেশের মানুষ অবাক হয়ে গেছে।

ইদানিং এরকম কিছু সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা ট্রেন্ড দেখা গিয়েছে যে, বিএনপির নেতাকর্মীদের পছন্দ তো করেই না বরং তাদের সাথে খারাপ আচারণ করে এবং সোস্যাল মিডিয়ায় নিজেকে ভাইরাল করার প্রবনতায় মত্ত হয়ে বিএনপি’র বদনাম করে।

বিগত ফ্যাসিবাদ সরকারের সময়ও এই কর্মকর্তারাই রাজনৈতিক লুটেরাদের সাথে মিলে মিশে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়েছিলো বলে ভুক্তভোগীরা জানান।

দেশ পরিচালনায় বিএনপির উদারতা ও নমনীয়তাকে পুঁজি করে কিছু কিছু সার্থন্বেষী মহল দ্বারা মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মীদের ত্যাগ ও অবদানকে অনেক ক্ষেত্রেই তুচ্ছজ্ঞান করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি বিদ্বেষ থেকে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা দেখা দিচ্ছে। একজন রাজনৈতিক কর্মী সারা জীবন আদর্শের পেছনে ব্যয় করলেও সরকারি দফতরে গিয়ে প্রাপ্য সম্মান বা পরিচয়টুকুও দিতে পারছেন না। উল্টো রাজনৈতিক পরিচয় পেলে অনেক কর্মকর্তা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন, যা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে রাজনৈতিক কর্মীদের একটি সুস্থ সমন্বয় থাকা জরুরি। কিন্তু বর্তমানে কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা’ এবং একক কর্তৃত্ব স্থাপনের মানসিকতা এই সেতুবন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আচরণবিধিতে কি আছে?

বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি আচরণ বিধিমালা আছে ১৯৭৯ সালের। । এটির নাম সরকারি কর্মচারি (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯। এটি অবশ্য ২০০২ সালে এবং ২০১১ সালে দুই দফায় সংশোধিত হয়। এই আচরণ বিধিমালায় মোট ৩৪টি নির্দেশনা আছে।

দেশে বা বিদেশে কারো কাছ থেকে উপহার বা পুরস্কার নেয়া, যৌতুক দেয়া-নেয়া, ব্যক্তিগত ব্যবসা, রাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী সহকর্মীর সঙ্গে আচরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি কর্মচারিদের কার্যক্রম কেমন হবে তার নির্দেশনা আছে। তবে শুধু নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ বিষয়ে আলাদা কোন বিধি নেই।

তবে নাগরিকদের সঙ্গে যে কোন অসদাচারণ শাস্তিযোগ্য হবে এমন একটি বিধি আছে ২০১৮ সালের সরকারি কর্মচারি (শৃংখলা ও আপিল) বিধিমালায়।সেখানে অসদাচারণের সংজ্ঞাও দেয়া আছে।

যেখানে অসদাচরণ বলতে বোঝানো হয়েছে- অসংগত আচরণ, চাকুরী-শৃংখলা হানিকর আচরণ কিংবা শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণকে। যদিও এসবেরও বিস্তারিত আলোচনা নেই।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃংখলা ও তদন্ত অনুবিভাগের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, এই আচরণবিধি এবং চাকুরী বিধির প্রশিক্ষণ নিয়েই কর্মকর্তারা চাকুরীতে যোগ দিয়ে থাকেন।

তিনি বলেন, "আচরণবিধিতে জনগণের কথা স্পেসিফিক না বলা থাকলেও সে কি কি করতে পারবে না, কোন কাজটা সরকারি কর্মচারীর জন্য শোভন, কোনটা অশোভন - এগুলো কিন্তু ডিটেইলস বলা আছে।"

"ভদ্রজনের জন্য অশোভন কোন আচরণ, সেটাই 'অসদাচারণ'। অর্থাৎ আমি যদি কোন অঙ্গ-ভঙ্গি করি, কোন শব্দ উচ্চারণ করি, এইযে নাগরিককে কান ধরে উঠবস করানো এগুলোও অসদাচারণ।"

কী শাস্তি আছে?

সরকারি কর্মচারি বিধিমালায় বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত আছে। সেখানে অসদাচারণকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা হয়েছে।

সব অপরাধেরই শাস্তি মূলত: দুই ধরণের - লঘুদণ্ড এবং গুরুদণ্ড।

লঘুদণ্ড আছে চার ধরণের। যেমন: তিরস্কার, নির্দিষ্ট মেয়াদে পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, জরিমানা এবং বেতন গ্রেডের অবনমন।

গুরুদণ্ডও আছে চারটি। যথা: বেতন গ্রেডের অবনমন, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকুরী থেকে অপসারণ এবং বরখাস্ত।

জনপ্রাশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব বলেন, কেউ অসদাচারণ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অন্যকোন অপরাধ করলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারিত হবে। কোন অভিযোগ আসলে তাকে নোটিশ, তদন্ত, বিভাগীয় মামলা সবকিছুরই লিখিত এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। কেউ শাস্তি পেলে এর বিরুদ্ধে আপিলও করা যায়।

সচেতন মহল মনে করছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতিটি নির্দেশ ও আচরণ অত্যন্ত নমনীয় ও মার্জিত হওয়া প্রয়োজন। কর্মকর্তাদের মনে রাখা উচিত, তারা জনগণের সেবক এবং সাধারণ মানুষের সাথে তাদের আচরণই সরকারের ভাবমূর্তি নির্ধারণ করে।

দেশের এই সংকটময় সময়ে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা ক্ষমতার মোহ ভুলে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাইকে একযোগে কাজ করা উচিত । জনস্বার্থে সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি সংস্কার এবং রাজনৈতিক কর্মীদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.