মোস্তফা কামাল আকন্দ
Published:2026-04-15 15:56:25 BdST
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজের জোরালো দাবিজলবায়ু পরিবর্তনে দ্বিগুণ সংকটে চরাঞ্চল: মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন ন্যায্যতার দাবি
মৌলিক স্বাস্থ্য সেবা জলবায়ু পরিবর্তনে সংকটাপন্ন উপকূলীয় বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের একটি উপেক্ষিত বাস্তবতা বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন মৌলিক ন্যায্যতার প্রশ্ন।
তারা বলেন, একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবার সংকট; বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষ আজ দ্বিগুণ সংকটে। দুর্গম চরাঞ্চলগুলোতে যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত, সেখানে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি যদি বাস্তব পরিবর্তন না আনে, তবে তা নিছক পরিসংখ্যানের উন্নয়ন হয়েই থাকবে। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবেনা না বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
তারা আরও বলেন, প্রসবকালীন সেবার উন্নয়নে চরাঞ্চলে প্রয়োজনীয় কমিউনিটি ক্লিনিক ও নিরাপদ মাতৃসেবা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে ও ধাত্রীদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে, আধুনিক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধাত্রীদের জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে হবে। দুর্গম এলাকায় নৌ-অ্যাম্বুলেন্স, ভাসমান ক্লিনিক ও মোবাইল মেডিকেল টিম চালু করে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী নিশ্চিত করে চরাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
আজ ১৫ এপ্রিল (মঙ্গলবার) জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে কোস্ট ফাউন্ডেশন, ইক্যুইটিবিডি এবং বিডিসিএস্ও প্রসেস কর্তৃক আয়োজিত “মৌলিক স্বাস্থ্য সেবা চরাঞ্চলের একটি উপেক্ষিত বাস্তবতা” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসকল দাবিসমূহ তুলে ধরেন।
কোস্ট ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক ও ইক্যুইটিবিডি-এর প্রধান সঞ্চালক জনাব এম রেজাউল করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে উক্ত সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিডিসিএসও প্রসেস-এর সমন্বয়কারি জনাব মোস্তফা কামাল আকন্দ, স্যোসাইটি ফর ডেভোল্যাপম্যান্ট ইনশিয়েটিভ এর সহকারি পরিচালক, জনাব সৈয়দ আশারফ হোসেন এবং সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশন-এর হেড-জলবায়ু পরিবর্তন, জনাব এম. এ. হাসান।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এম. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, চরাঞ্চলে প্রায় ১ কোটি মানুষ বসবাস করে, যারা বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে দ্বিগুণ সংকটে রয়েছে। দুর্যোগের সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চিকিৎসার কোনো ব্যবসস্থাই থাকে না।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে চরাঞ্চলের মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। চিকিৎসাসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি মৌলিক অধিকার।
তিনি চরাঞ্চলে ৪জি নেটওয়ার্ক চালুর মাধ্যমে টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান, যাতে মানুষ সহজেই এমবিবিএস চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারে। এছাড়া তিনি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপদ মাতৃসেবাকেন্দ্র স্থাপন এবং ধাত্রীদের আধুনিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে তারা জটিল পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে।
মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, চরাঞ্চলে বসবাসরত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। আসন্ন জাতীয় বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ কমপক্ষে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে তা বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি চরাঞ্চলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং মোবাইল মেডিকেল টিম জোরদার করে সবচেয়ে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এটা রাষ্ট্রের জরুরী দায়িত্ব।
এম. এ. হাসান তার বক্তব্যে উদাহরন দিয়ে বলেন, পটুয়াখালীর-চরহাদি, ভোলার-চরমোজাম্মেল, চর জহিরউদ্দিন, চটকিমারা, নাগরপাটওয়ারীর চর, চর নিউটন -এর মতো অসংখ্য চর রয়েছে উপকূলে, যেখানে লক্ষ-লক্ষ মানুষ বাস করে, কিন্তু নুন্যতম স্বাস্থ্যসেবা নেই, নেই কোন কমিউনিটি ক্লিনিক, অথচ এই ব্যপারে যথাযথ পদক্ষেপও দেখতে পাচ্ছিনা। চরাঞ্চলকে সাধারণ গ্রামীণ এলাকার অংশ হিসেবে বিবেচনা না করে “চরাঞ্চল স্বাস্থ্যখাত” নামে পৃথক বাজেট লাইন প্রণয়ন করা জরুরি।
তিনি দাবি করেন, বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা স্বাস্থ্য বাজেট ও লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
সৈয়দ আশরাফ হোসেন বলেন, প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিতেও স্থানীয়দের দীর্ঘ, ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা বা জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হয়, যা যথেষ্ট সময় ও ব্যায় সাপেক্ষ ও ঝঞ্ঝাটপূর্ণ। দুর্যোগকালীন সময়ে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চিকিৎসাসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয় এখানকার অধিবাসীরা। ফলে সাধারণ রোগও মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সেবার অভাবে মা ও নবজাতকের মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। জরুরি মুহূর্তে রোগী অথবা গর্ভবতী মায়েদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ও বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
