বিশেষ প্রতিবেদক
Published:2026-04-06 22:55:31 BdST
সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজার, স্বল্প খরচে কর্মী প্রেরণ, সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে সুযোগ দেয়ার আহ্বানমালয়েশিয়া শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট হোতাদের বিচার দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর বায়রার স্মারকলিপি
জনশক্তি রফতানি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় যোগান আসে এই খাত থেকে। কিন্তু সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের যোগসাজশে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে চরম অরাজকতা, অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন।
সিন্ডিকেটের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রথমসারির অধিকাংশ পত্রিকা ও টেলিভিশনে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে (কপি সংযুক্ত) এবং আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের এসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও টাকা পাচার নিয়ে দুদক ও ডিবিতে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।
৫ই আগষ্টের পর থেকে পলাতক মালয়েশিয়া শ্রমবাজার সিন্ডিকেটের মূলহোতা রুহুল আমিন স্বপন ও তার আওয়ামী সহযোগীরা বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী কিছু লোককে নিয়ে সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা এবং সরকারকে চরম বিব্রত করার জন্য বিদেশে বসে পুনরায় মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট করার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে গঠিত এই সিন্ডিকেট কোনভাবেই বর্তমান সরকারের আমলে পুনরায় প্রতিস্থাপন হতে পারে না বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন এই খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগন।
এদিকে, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সংঘটিত সিন্ডিকেট হোতাদের বিচার এবং সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজার, কম খরচে কর্মী প্রেরণের নিমিত্তে সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উম্মুক্তকরণের আহবান জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা) এর ভুক্তভোগী সদস্যবৃন্দ।
সম্প্রতি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক কোটি কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিতের লক্ষ্য নির্ধারণ করে জনশক্তি রপ্তানির সাথে যুক্ত সবাইকে স্পষ্টভাষায় জানিয়েছেন যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা পাবে না বরং যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করবে। প্রধানমন্ত্রীর এমন আহবানকে সাধুবাদ জানিয়ে বায়রার ভুক্তভোগী সদস্যরা বলেছেন, "প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোন প্রকার সিন্ডিকেট ছাড়াই দেশের সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সীকে সম্পৃক্ত করে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরী।"
প্রধানমন্ত্রী বরাবর পেশকৃত স্মারকলিপিতে বায়রার ভুক্তভোগী সদস্যরা উল্লেখ করেন ২০১৬ সালে ১০টি এজেন্সী এবং ২০২২ সালে ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে সিন্ডিকেট তৈরি হয়। যদিও পরবর্তীতে সেটি ১০০টি এজেন্সিতে রুপান্তর হয়। সর্বশেষ ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে জনশক্তি রপ্তানি করা হয়।
এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষ ব্যক্তিবর্গরা হচ্ছেন লে. জেনারেল মাসুদ (সাবেক এমপি), সালমান এফ রহমান (সাবেক উপদেষ্টা), রুহুল আমিন স্বপন (বায়রার সাবেক মহাসচিব),দাতোশ্রী আমিন নুর (মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ী), লোটাস কামাল (সাবেক অর্থমন্ত্রী), নিজাম উদ্দিন হাজারী (সাবেক এমপি), বেনজীর আহমদ (সাবেক এমপি), আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম (সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পিএস), মহিউদ্দিন মহি, কাজী মফিজুর রহমান (সাবেক বায়রা ইসি সদস্য), মনসুর আহমেদ কালাম (আওয়ামী লীগ নেতা), শফিকুল আলম ফিরোজসহ অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ।
সিন্ডিকেট গঠনের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান নাগরিক দাতোশ্রী আমিনের 'বেস্টিনেট' নামক একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনলাইন রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতি চালু করে মালয়েশিয়া। এই পদ্ধতির মাধ্যমে মালয়েশিয়া সরকারের সাথে শুধুমাত্র বিদেশ থেকে কর্মী আনয়নে অনলাইন সাপোর্ট এর জন্য চুক্তি হয়। কিন্তু সুচতুর আমিন নূর দুই দেশের সরকারের অসাধু ব্যক্তিদের ও তার পার্টনার বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপনকে নিয়ে এই পদ্ধতির অপব্যবহার করে কর্মী পাঠানোর সকল প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং জনশক্তি রপ্তানি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে।
উক্ত অনলাইন রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে মালয়েশিয়া আরও ১৪ টি দেশ থেকে কর্মী নিলেও একমাত্র বাংলাদেশ ব্যতীত অন্য কোন দেশে জনশক্তি রপ্তানিতে কোনো সীমাবদ্ধতা ছিলো না এবং কোনো প্রকার সিন্ডিকেট কেউই করতে পারেনি। অথচ এই অসাধু চক্র বাংলাদেশ সরকারকে বলে; মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট চায়; অন্যদিকে মালয়েশিয়া সরকারকে বলে; বাংলাদেশ সরকার সিন্ডিকেট চায়। এভাবেই তারা বারবার সিন্ডিকেট তৈরী করে।
বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে নতুন করে ‘ট্রাফ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবারও সিন্ডিকেট গঠনের চেষ্টা চলছে। ‘গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টার’ নামে একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়, যা মূলত এজেন্সি ও কর্মীদের নিয়ন্ত্রণের কৌশল বলে তারা মনে করেন।
বায়রা নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, নতুন প্রস্তাবের আড়ালে ২৫টি এজেন্সিকে নিয়ে একটি গোপন সিন্ডিকেট গঠন করা হয়েছে, যেখানে অন্তর্ভুক্ত হতে বিপুল অঙ্কের অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ এজেন্সিগুলো বাজার থেকে ছিটকে পড়বে এবং কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বাড়বে।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সুপরিকল্পিতভাবে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষর হওয়া সমঝোতা স্মারকে মালয়েশিয়া সরকারকে জনশক্তি রপ্তানির জন্য বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি নির্ধারণ করার দায়িত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে নতুন করে সিন্ডিকেটের বীজ বপন করা হয় ।
সিন্ডিকেটে লাইসেন্স অর্ন্তভুক্তকরণ প্রক্রিয়া
অতীতে রুহুল আমিন স্বপন ও দাতোশ্রী আমিন তাদের অনুগত ও পছন্দনীয় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে ৫-৮ কোটি টাকার বিনিময়ে সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। বর্তমানেও তারা বিনা পয়সায় কর্মী নিয়োগের কথা বলে সিন্ডিকেটে লাইসেন্স সম্পৃক্ত করার জন্য ১৫ কোটি টাকা দাবী করছে।
সিন্ডিকেট চক্রের কারণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিভিন্ন প্রকার সমস্যা
> বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে বিমান টিকেট-ভিসাসহ সকল খরচ বাদে অতিরিক্ত ১,৫২,০০০/- টাকা বাধ্যতামূলক চাঁদা আদায় করেছিল এই সিন্ডিকেট চক্র। ফলে প্রত্যেক কর্মীকে ৪-৫ লক্ষ টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া যেতে হয়েছিল। দুই দফায় মালয়েশিয়ায় প্রেরিত প্রায় ৮ লক্ষ কর্মী থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছিল তারা। উক্ত টাকার মধ্যে এই সিন্ডিকেট কর্মীপ্রতি ১,০৭,০০০/- টাকা প্রেরণ করতো মালয়েশিয়ার আইটি প্রতিষ্ঠান 'বেস্টিনেট' এর মালিক দাতুশ্রী আমিনকে।
> দুই দফায় প্রায় ২৫ লক্ষ যাত্রীর মেডিকেল স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রত্যেক কর্মী বাবদ ৩,০০০/- টাকা করে মোট ৭৫০ কোটি টাকা মেডিক্যাল চেকআপ বাবদ চাঁদা দিতে হয়েছিলো। সিন্ডিকেটের প্রত্যেকটি লাইসেন্সকে কমপক্ষে ৫-৮ কোটি টাকার বিনিময়ে অর্ন্তভুক্ত করতো অসাধু চক্রটি।
> মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার মাত্র কয়েকজন ব্যক্তির হাতে জিম্মি ছিল। এর ফলে অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধি ও দুই দেশের সুনাম নষ্ট হয়েছে।
> প্রায় ২৫০০ সরকার অনুমোদিত এজেন্সির মধ্যে ২০১৬ সালে ১০টি, ২০২২ সালে প্রথমে ২৫টি এবং পরবর্তীতে ১০০টি এজেন্সি দ্বারা সিন্ডিকেট হওয়ায় অবশিষ্ট সকল এজেন্সী বৈষম্যের স্বীকার হয়েছে।
> অনিয়ম, দুর্নীতি ও টাকা পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শ্রম বাজার বার বার বন্ধ হয়েছে।
> যে সকল নিয়োগকর্তা বিনা খরচে কর্মী নিতে চায় তারা সিন্ডিকেট ফীর কারণে হাজার হাজার বাংলাদেশী কর্মী নিতে পারেনি।
> নির্দিষ্ট সংখ্যক এজেন্সি দ্বারা সিন্ডিকেট হওয়ায় সীমাবদ্বতার কারণে কম সময়ে অথবা যথাসময়ে বেশি কর্মী যেতে পারেনি; ফলে সর্বশেষ চূড়ান্ত ভাবে বর্হিগমন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া ১৭ হাজার কর্মীসহ মোট ৫০ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া যেতে পারেনি।
> সিন্ডিকেটের অনিয়মের কারণে অসংখ্য কর্মী মালয়েশিয়া যাওয়ার পর চাকুরী, বেতন ও বাসস্থান না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেছে।
পুনরায় সিন্ডিকেট হলে সরকারের যে সমস্যা হবে
বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী কাজ করেন এবং বাংলাদেশে তাদের আত্মীয়স্বজন আছে প্রায় পাঁচ কোটি। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারও ফ্যাসিবাদী সরকারের মতো সিন্ডিকেট হলে এই খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিদেশগামী কর্মী, প্রবাসী ও তাদের আত্মীয়স্বজনসহ প্রায় ৬-৭ কোটি মানুষের মধ্যে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের ব্যাপারে বিরুপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। একইসাথে দেশ ও বিদেশের গণমাধ্যমগুলো পূর্বের ন্যায় সিন্ডিকেটের অনিয়ম, দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এর ফলে সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ভীষনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
সিন্ডিকেট বিহীন উন্মুক্ত রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতির সুবিধা
১) সিন্ডিকেট নামক কোন গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত চাঁদা দিতে না হওয়ায় কর্মীরা কম খরচে বিদেশ যেতে পারবে।
২) সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সী যার যার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে পারবে।
৩) বার বার শ্রম বাজার বন্ধ হবে না ও কম সময়ে বেশী লোক যেতে পারবে
৪) দুই দেশের সুনাম নষ্ট হবে না এবং সরকারের সুনাম ও ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পাবে।
৫) জনশক্তি রফতানিতে অরাজকতা, অনিয়ম, দূর্নীতি ও টাকা পাচার বন্ধ হবে।
৬) আরবিএ (রেসপনসিবল বিজনেসেস এলায়েন্স) এর সদস্য কোম্পানিগুলোতে বিনা খরচে কর্মী প্রেরণ করা যাবে
দশটি ক্রাইটেরিয়ার সমস্যা
মালয়েশিয়া প্রদত্ত ১০টি শর্ত (যেমন ১০,০০০ স্কয়ার ফিট অফিস, ৩০০০ কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা) অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয়। এই শর্ত অন্য কোনও দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়নি এবং এটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এবার অনেক ভালো রিক্রুটিং এজেন্সি আবেদনই করেনি আর কিছু অসাধু এজেন্সি ভুয়া তথ্য দিয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; যা আবারও সিন্ডিকেট তৈরির ইঙ্গিত বহন করে।
সিন্ডিকেট না করে কম খরচে কর্মী পাঠানোর বিকল্প প্রস্তাবসমূহ
রিক্রুটিং এজেন্সি নির্ধারণ
বর্তমান সমঝোতা স্মারকে উল্লেখ রয়েছে যে, কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে “বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়া সরকার নির্বাচন করবে”। এই ধারা সংশোধন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক প্রেরণকারী অন্যান্য ১৪টি দেশের ন্যায় মালয়েশিয়ান নিয়োগকর্তা অথবা বাংলাদেশ সরকার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করবে। এর ফলে কোনো একক পক্ষের প্রভাব কমবে, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং সিন্ডিকেট গঠনের সুযোগ কার্যকরভাবে বন্ধ হবে।
বিতর্কিত অনলাইন পদ্ধতি বাদ দিয়ে বিকল্প স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য অনলাইন পদ্ধতি
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের মূল উৎস দাতোশ্রী আমিনের মালিকানাধীন বেস্টিনেট কোম্পানির অনলাইন পদ্ধতি। ইতোমধ্যে দুই দফায় প্রমাণিত হয়েছে যে এই কোম্পানিটি সম্পূর্ণভাবে বিতর্কিত। বর্তমানে নতুন করে ‘ট্রাফ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবারও সিন্ডিকেট গঠনের চেষ্টা চলছে। ‘গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টার’ নামে একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়, যা মূলত এজেন্সি ও কর্মীদের নিয়ন্ত্রণের কৌশল বলে তারা মনে করেন।
বায়রা নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, নতুন প্রস্তাবের আড়ালে ২৫টি এজেন্সিকে নিয়ে একটি গোপন সিন্ডিকেট গঠন করা হয়েছে, যেখানে অন্তর্ভুক্ত হতে বিপুল অঙ্কের অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ এজেন্সিগুলো বাজার থেকে ছিটকে পড়বে এবং কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বাড়বে। সুতরাং, সিন্ডিকেট এড়াতে স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প অনলাইন পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য মালয়েশিয়া সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো প্রয়োজন।
অভিবাসন খরচ কমানো ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের জন্য সরকার নির্ধারিত যৌক্তিক খরচ নিশ্চিত করতে বুয়েট এর তৈরিকৃত অ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধন করে একটি কেন্দ্রীয় ডাটা ব্যাংক গঠন করতে হবে। এই ডাটা ব্যাংক থেকেই কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কর্মী নির্বাচন করবে। কর্মীরা সরকার নির্ধারিত ফি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে তিন কিস্তিতে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিকে পরিশোধ করবে। এর ফলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ থাকবে না। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, কর্মীরা প্রতারণা থেকে সুরক্ষিত থাকবে এবং সিন্ডিকেটের প্রভাবও কার্যকরভাবে নির্মূল হবে।
মালয়েশিয়া সরকারের লিমিটেড লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
মালয়েশিয়া সরকার যদি একান্তই লিমিটেড লাইসেন্সের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু রাখতে চায়, সেক্ষেত্রে একমাত্র সরকারি সংস্থা ইগঊঞ/ইঙঊঝখ-কে মেইন এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। এই ব্যবস্থায় একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার গড়ে তূলে আগ্রহী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো তাদের নিজস্বভাবে সংগৃহীত ডিমান্ড ইগঊঞ/ইঙঊঝখ-এর সহযোগিতায় নির্ধারিত সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে মালয়েশিয়ার প্রেরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এর ফলে প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ হবে,খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সিন্ডিকেট গঠনের সুযোগ থাকবে না।
এমতাবস্থায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদয় বিবেচনার জন্য বায়রা নেতৃবৃন্দ স্মারকলিপিতে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ পেশ করেছেন।
১. উল্লিখিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা
২. মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট প্রথা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা
৩. কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়নের জন্য আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক অনলাইন সিস্টেম চালু করা
৪. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন বাধ্যতামূলক করে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
৫. কমখরচে কর্মী পাঠানোর নিশ্চিত করার জন্য মধ্যস্বত্বভোগী (মিডেলম্যান) সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা
৬. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা (যেমন ইঙঊঝখ)-এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধানে কর্মী প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ
মালয়েশিয়ায় বন্ধ থাকা শ্রমবাজার ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য না হয়ে দেশটিতে শ্রমিক প্রেরণকারী অন্য ১৪টি দেশের ন্যায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধ সকল রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উম্মুক্ত করার বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকারের আন্তরিকতা, মানবিক নেতৃত্বে ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে, দেশের গরীব নিরীহ বিদেশগামী কর্মীদের স্বার্থে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সবার অংশগ্রহনমূলক প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করার আকুল আবেদন জানিয়েছেন বায়রা নেতৃবৃন্দ।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
