Shamiur Rahman

Published:
2019-10-10 21:08:08 BdST

যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেমের সহচর আফতাবুর রহমানইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন ও হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তার কোটি কোটি টাকার সম্পদের উৎস কোথায়!


গোল বৃত্তে চিহ্নিত আফতাবুর রহমান

বিশেষ প্রতিনিধি:

আফতাবুর রহমান ১৯৮২ সালে নাটোর জেলা ছাত্রশিবির সভাপতি ছিলেন। সেই সুবাদে শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতি মীর কাশেম আলীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ১৯৯৩ সালে মীর কাশেম আলীর মাধ্যমে মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার (তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী) পদে চাকরি শুরু। সেই সঙ্গে ঢাকা মহানগর জামায়াতের রাজনীতিতে যুক্ত হন। এর পর একের পর এক পদন্নোতি পেয়ে তরতর করে উঠে আসেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের উচ্চপদে।

অপরদিকে ঐ ঘনিষ্ঠতাকে পুঁজি করে বাগিয়ে নেন ঢাকা মহানগরী জামায়াতের রোকন পদ। পল্টন থানা জামায়াতের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ২০০৮ সাল থেকে। এদিকে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের হাসপাতাল কো-অর্ডিনেটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে নিজের ভাই, শ্যালক, ভাইয়ের মেয়ে থেকে শুরু করে নিকট-দূরের আত্মীয় স্বজন এবং নিজ এলাকার অন্তত ২০০ জনকে অবৈধ সুবিধার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় চাকুরী দেন। পাশাপাশি নিজে অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হয়েছেন। ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, ছেলে-মেয়েদের ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার বানিয়েছেন অল্প সময়ের মাঝে। তার এই অনিয়ম দুর্নীতির কারণে বেশ কয়েক বার ব্যাংক ফাইন্ডেশন থেকে তাকে সরে যেতেও হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই উপর মহলকে ম্যানেজ ও জামায়াতের প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় পদটি আকড়ে রাখেন। অবশ্য বর্তমানে তিনি সেই পদে নেই। এখন তিনি ময়মনসিংহ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে এই ডিমোশন করা হলেও আবারও ফাউন্ডেশনে পূর্বের পদে ফিরতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে তথ্য রয়েছে। অপরদিকে তার আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই ব্যাংক ফাউন্ডেশনের ঢাকা, রাজশাহী, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র বলছে, যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের পর মূলত আফতাব পরিবারের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন ও ফাউন্ডেশন পরিচালিত সারাদেশের হাসপাতালগুলো। এই সিন্ডিকেটের কাছে ফাউন্ডেশন ও হাসপাতালের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রীতিমত জিম্মি।

দুর্নীতির দায়ে ডিমোশন 

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মাস দুই আগে লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পর আফতাবুর রহমানকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, ময়মনসিংহে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। এর আগে তিনি সারাদেশের ইসলামী ব্যাংক হাসাপাতালগুলোর কো-অর্ডিনেটর হিসেবে ইসলামিক ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এই ডিমোশনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ফাউন্ডেশনের একটি কুচুক্রি মহল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। 'তারাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে উপর মহলে। কিন্তু তদন্তে কোনো অভিযাগ সত্য প্রমাণিত হয়নি।' তার বক্তব্য অনুযায়ী অভিযোগের তদন্তের স্বার্থে তাকে ডিমোশন দিয়ে ময়মনসিংহে পাঠানো হয়েছে। দ্রুতই তিনি আবারও ফাউন্ডেশনে পূর্বের কো-অর্ডিনেটর পদ ফিরে পাবেন বলে আশা করছেন। তবে শাস্তিমূলক নিম্নপদে বদলির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার তাকে নিম্নপদে শাস্তিমূলক বদলি হতে হয়েছিল। শুধু তাই নয়, দুর্নীতির অভিযোগ একবার ব্যাংক ফাউন্ডেশন থেকে চাকরিও হারাতে হয়েছিল আফতাবুর রহমানকে। অনিয়ম-দুর্নীতি ছাড়া তার অন্য কোনো দক্ষতা বা যোগ্যতা না থাকলেও শিবিরের সাবেক নেতা ও বর্তমানে জামায়াতের রোকন হওয়ার সুবাদে এবং মীর কাসেম আলীর আস্থাভাজন হওয়ায় তাকে দমে যেতে হয়নি।

সূত্র বলছে, দুর্নীতির দায়ে একবার ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন থেকে তার চাকরি চলে যায়। এর পর তৎকালীন দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও জামায়াতের নীতিনির্ধারক (যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকার হওয়া) মীর কাশেম আলীকে রাজহাঁসের মাংস খাইয়ে ও পায়ে ধরে দিগন্ত টিভির প্রশাসনিক পদে চাকরি নেন। অবশ্য মীর কাশেম আলী ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনেরও তখন প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে ছিলেন। এদিকে, দিগন্ত টিভি ধর্মীয় উস্কানির দায় বন্ধ হলে যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেমের আস্থাভাজন আফতাব ফের ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে চাকরি বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন। এরই মধ্যে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মীর কাশেমসহ জামায়াতের শীর্ষনেতাদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। জামায়াতের দখল থেকে ইসলামী ব্যাংক ও ব্যাংক ফাউন্ডেশন উদ্ধার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন ও হাসপাতালগুলো সাবেক শিবির নেতা আফতাব সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে আফতাবুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার সঙ্গে বর্তমানে জামায়াত-শিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি ‌'সরকারের পারপাস' বাস্তবায়ন করার কারণেই নাকি ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন।

আফতাব চক্র 

নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে এবং মীর কাসেম আলীকে ম্যানেজ করে নিজের সহোদর ভাই, চাচাতো ভাই, শ্যালক, ভাইয়ের মেয়েসহ আত্মীয়দের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি দিয়েছেন আফতাব। সূত্রমতে তাদের অনেকেই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায় এসব চাকরি দেয়া হয়। এর মধ্যে তার চাচাতো ভাই আনিসুর রহমান বর্তমানে মিরপুর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে সহকারি সুপার পদে রয়েছেন। শ্যালক আতিউর রহমান (প্রশাসন) ও ভাইয়ের মেয়ে মরিয়ম জামিলা মেরি (ওটি অপারেটর) ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল মতিঝিলে এবং বরিশাল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে তার আপন ভাই গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত।

আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ আফতাব, বাড়ি নাটোরে। নিম্নবৃত্ত পরিবারের সন্তান আফতাব। ওয়ার্ড মাস্টার পদে মাত্র ৫ হাজার টাকায় চাকরি জীবন শুরু ৯৩ সালের মার্চে। মাত্র ২৬ বছরের ব্যবধানে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন শিবিরের সাবেক এই নেতা।

বর্তমানে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকা পল্টনের পল্টন টাওয়ারে ১২ তলায় বিশাল স্পেসের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। এই ফ্ল্যাটটির দাম বর্তমান বাজার মূল্যে কমপক্ষে ২ কোটি টাকা। তবে এখানেই শেষ নয়। জানা গেছে সেগুনবাগিচায় সাগুপ্তা হাইজিংয়ে তার আরও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্লট রয়েছে মিরপুরে জামায়াত অধ্যুষিত ধানসিঁড়ি প্রকল্পে। এছাড়া গ্রামের বাড়িতেও অনেক স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে তথ্য মিলেছে। ইসলামী ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকে এফডিআরের নামে নগদ বিপুল অর্থ জমা রয়েছে এবং শেয়ারবাজারে তার বড় অংকের বিনিয়োগ রয়েছে বলেও সূত্র বলছে।

অবশ্য এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, মিরপুরের প্লট বিক্রি করে এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পল্টন টাওয়ারে ফ্ল্যাট কিনেছেন। ২৬ বছর চাকরি করে এটা করা অস্বাভাবিক কিছু নয় বলেও তার দাবি। তবে তার মতো আর কতজন যাকাতের অর্থে পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনে চাকরি করে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন তা জানা সম্ভব হয়নি।

তাছাড়া একমাত্র আফতাবুর রহমানই ওয়ার্ড মাস্টার থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসার সুযোগ পেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটিতে। যা রীতিমতো নজিরবিহীন ঘটনা। অভিযোগ আছে, তার দুই ছেলেমেয়ে রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফ্রি লেখাপড়া করেছেন। অবশ্য তিনি সেটা সত্য নয় দাবি করে বলেন, তার দুই সন্তানের একজন ইঞ্জিনিয়ার আরেকজন ডাক্তার। রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার ছেলেকে পড়ানোর কথা স্বীকার করলেও তা ‌'ফ্রি নয়'। কিন্তু বেসরকারি মেডিকেলে সন্তানকে পড়ানোর মতো এত টাকা চাকরি করে তিনি কীভাবে যোগালেন এমন প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি।

সম্প্রতি বাসাবোতে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের নামে জমি ক্রয়ে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এই আফতাবুর রহমানের বিরুদ্ধে।এই বিষয়ে ‘দি ফিন্যান্স টুডে’ অনুসন্ধান শুরু করেছে। আগামীতে এই বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হবে।

এদিকে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর মীর কাশেম আলীর সম্পদ তিনি কিভাবে আত্মসাৎ করেছেন এই নিয়ে আমাদের দ্বিতীয় পর্ব আসছে খুব শীঘ্রই। মীর কাশেমের সাথে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে আফতাবুর রহমানের অজানা সম্পদের জট খুলবে পরবর্তী পর্বের ঐ অনুসন্ধানী রিপোর্টে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.


Popular Article from FT বাংলা