নেহাল আহমেদ
Published:2026-04-23 22:52:18 BdST
হাতপাখা: ঐতিহ্য, প্রয়োজন ও বর্তমান বাস্তবতা
গরমের দেশে মানুষ সবসময়ই স্বস্তির খোঁজে থেকেছে। সেই চাহিদা থেকেই জন্ম হয়েছে হাতপাখার। সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, হাতপাখা আজও মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে আবহমান ঐতিহ্যের সাক্ষী এই হাতপাখা। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুতের সহজলভ্যতার কারণে হাতপাখার কদর অনেকটাই কমে গেছে। তীব্র গরমে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত তখন সামান্য হাতপাখার শীতল বাতাসের জাদুকরী ছোঁয়ায় দেহে আসে প্রশান্তি। এটি শুধু গরম থেকে বাঁচার একটি সাধারণ উপকরণ নয়—এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
বাংলার গ্রামাঞ্চলে তালপাতা, বাঁশ বা খড় দিয়ে তৈরি হাতপাখা একসময় ঘরে ঘরে ছিল অপরিহার্য। প্রায় চারশ বছরেরও অধিক এই ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে, যা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বহন করে। বিয়ের আয়োজন থেকে শুরু করে গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন ব্যবহারে হাতপাখার উপস্থিতি ছিলো লক্ষণীয়।
ইতিহাস

তবে, হাতপাখার ইতিহাসের কথা বলতে গেলে তা ছিল অনেক প্রাচীন। প্রায় তিন হাজার বছর আগে হাতপাখার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। প্রাচীন গ্রীক, পারস্য বা রোমান সাম্রাজ্যে রাজপ্রাসাদে ময়ূর পালক বা রেশমি কাপড় দিয়ে বড় করে ঝুলানো পাখা বানানো হতো, যা দড়ি টেনে টেনে দুজন লোক দিন-রাত বাতাস করত সিংহাসনে। মুঘল বা নবাবী আমলেও টানা পাখার প্রচলন ছিল। তখনকার সেই পাখাগুলো ছিল বেশ বড় আর ওজনে অনেক ভারী। এছাড়া, ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন, জাপানসহ প্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও হাতপাখার ব্যবহার ছিল। প্রাচীনকালে মধ্যপ্রাচ্যে পশুর চামড়ার তৈরি অলংকৃত অনেক পাখার সন্ধান পাওয়া গেছে।
তবে পাখা বলতে গ্রামবাংলার মানুষ এখনও গরমে শীতল বাতাস পাওয়ার অবলম্বন হাতপাখা বোঝে। এই কারণে দিন দিন ব্যবহার সহজ করা ও কায়িক শ্রম কমানোর লক্ষ্য হাতপাখা এসে যায় মানুষের হাতের মুঠোয়। তালের পাখা বানাতে তালের ডালসহ পাতা একসঙ্গে ব্যবহার হতো। তবে তালপাতার হাতপাখা আবার ঘুরানো যায় না।
নির্মাণশৈলী

সুতা, বাঁশ, চুলের ফিতা, বেত, খেজুরপাতা, নারকেলপাতা, তালপাতা, কলার শুকনো খোল, পাখির পালক, সুপারির খোল, শোলা, গমের ডাঁটা, মোটা কাগজ প্রভৃতি পাখার উপাদান। বিভিন্ন ডিজাইনে এ পাখা তৈরি হয় এবং এগুলোর বিভিন্ন নামও রয়েছে। এর মধ্যে পানগুছি, কেচিকাটা, তারাজো, পুকুই রাজো, ধানছড়ি, ফলং ঠেইঙ্গা, ফড়িংয়ের ঠ্যাং, রাবন কোডা, নবকোডা, কবুতর খোপ, মাকড়ের জাল, পদ্মজো, কামরাঙ্গা জো, ধাইড়া জো, সুজনি জো, চালতা ফুল, কাগজ কাটা, হাতি, মরিচ ফুল, আটাসান, শঙ্কলতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
আর্থিক গুরুত্ব
বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় পাখা তৈরি হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনেও শীর্ষে রয়েছে। এর পাশাপাশি ময়মনসিংহ, নরসিংদী, রংপুর, দিনাজপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জেলায় হাতপাখা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, নওগাঁ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল, বরিশাল অঞ্চলেও পাখা তৈরি হয়। এসব পাখা নির্মাণশৈলীতে স্থানীয় পরিবেশ-প্রতিবেশের সমন্বয়ে নকশা নমুনার নানা দিক ফুটে উঠেছে এবং ব্যবহারেও বৈচিত্র্যপূর্ণ দিক রয়েছে।

হাতপাখা তৈরীর এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন কয়েক হাজার পরিবার। হাতপাখা তৈরি এবং তা বিক্রি করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন তারা। ফলে এই জেলাগুলোর অধিকাংশ এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের হাতপাখা। জানা গেছে, উৎপাদিত এসব হাতপাখার বাৎসরিক বাজার মূল্য দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা
তবে বর্তমান সময়ে হাতপাখা শুধু ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে থাকেনি, বরং এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথেও গভীরভাবে জড়িত। একসময় যে হাতপাখার দাম ছিল মাত্র ২০ টাকা, আজ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ টাকায়। সুযোগের সদ্ব্যবহার যেমন মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা, তেমনি বাজার ব্যবস্থায় এর প্রভাবও স্পষ্ট। চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, শ্রমের মূল্য এবং পরিবহন খরচও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, এই হাতপাখা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন অনেক গ্রামীণ কারিগর। তাদের পরিশ্রম, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা এই সাধারণ জিনিসটিকে একটি শিল্পে পরিণত করেছে। কিন্তু তারা সবসময় ন্যায্য মূল্য পান না—এটাই দুঃখজনক সত্য। ফলে একদিকে যেমন বাজারে দাম বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদকদের জীবনযাত্রা ততটা উন্নত হচ্ছে না।
ইদানীং, লোডশেডিং হলে গরমে স্বস্তি পেতে আজকাল চার্জার ফ্যানের প্রচলন বেড়েছে। যার ফলে নগরাঞ্চলে এখন হাতপাখার ব্যবহার দেখা যায় না বললেই চলে। তবু গ্রামীণ সমাজে হাতপাখার ব্যবহার একবারে নেই–তা কিন্তু নয়। শহরের অনেক মানুষের কাছে হাতপাখা হয়েছে শৌখিন বস্তু। অনেকে নকশা করা হাতের তৈরি হাতপাখা ঘরে সাজিয়ে রাখেন। কারণ, হাতপাখার নকশায় গ্রামবাংলার লোকচিত্র ফুটে ওঠে, যা দেখতে বেশ মনোমুগ্ধকর। গ্রামের মা, দাদি-নানিরা পাখা বানাতেন যাতে ফুটে উঠত তাদের রুচি, মনন ও চিন্তাচেতনার শৈল্পিক প্রকাশ। এদিক থেকে সৌন্দর্যের বিচারে এগিয়ে আছে নকশী পাখা। সুতা দিয়েই পাখার গায়ে পাখি, ফুল, লতাপাতা কিংবা ভালোবাসার মানুষের নাম অথবা ভালোবাসার চিহ্ন ফুটিয়ে তোলা হয়।
বিলুপ্তি রোধে করনীয়
আবহমানকাল থেকে যখন বিদ্যুত সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিলো না সে সময় থেকেই মানুষের দেহ শীতল করার জন্য ব্যাবহৃত হতো হাতপাখা। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত নানাভাবে পাখার ব্যবহার চলছে। এখন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাতপাখা বিলুপ্তির পথে। এক যুগ আগেও গ্রামবাংলার উপজেলায় হাতপাখার ব্যাপক প্রচলন ছিল। বর্তমানে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে, বৈদ্যুতিক পাখার সুবাদে এর প্রচলন এখন নেই বললেই চলে।
হাতপাখা গ্রামীণ মানুষের জীবনের ইতিকথা তুলে ধরে, সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরে, মাটি ও মানুষের সংগ্রামের কথা বলে, লোককথা আর কবিতার কথা বলে। পহেলা বৈশাখ বা চৈত্র সংক্রান্তিসহ বিভিন্ন মেলায় হাতপাখার সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে।
সবশেষে বলা যায়, হাতপাখা আমাদের জীবনের একটি ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু একটি ব্যবহারিক জিনিস নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। তাই এই হাতপাখা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে হাতপাখার ব্যবহার বাড়ানো উচিত বলে মনে করে সচেতন মহল। আধুনিকতার ভিড়ে এই সহজ সরল উপকরণটির গুরুত্ব যেন আমরা ভুলে না যাই—এটাই আমাদের দায়িত্ব।
লেখক একজন বিশিষ্ট কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
