বিশেষ প্রতিবেদক
Published:2026-05-03 23:02:16 BdST
সাভারের বিতর্কিত সাব রেজিস্ট্রার জাকিরের বিরুদ্ধে মামলা
ঢাকা জেলার সাভার উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে অবশেষে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আজ ৩রা মে (রবিবার) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অফিস আদেশে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে অপসারণসদৃশ অবস্থায় সংযুক্ত (অ্যাটাচ) করা হয়েছে মহাপরিদর্শক; নিবন্ধন দপ্তরে।
আইন ও বিচার বিভাগের যুগ্ম সচিব (রেজিস্ট্রেশন) হাসান মাহমুদুল ইসলাম এবং সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ আযিযুর রহমানের যৌথ স্বাক্ষরে এই অফিস আদেশ জারি করা হয়। এই আদেশ কার্যত জাকিরকে কর্মহীন অবস্থায় ফেলেছে।
অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮’-এর বিধি ৩ (খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এবং বিধি ৩ (ঘ) অনুযায়ী দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নম্বর-০১/২০২৬ দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রত্যাহার করে নিবন্ধন অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাকে অবিলম্বে বর্তমান দায়িত্বভার হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংযুক্ত অবস্থায় তার নিয়মিত বেতন-ভাতাও স্থগিত করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক ধরনের প্রাথমিক বরখাস্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৬ সালে কোন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে সরাসরি আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিভাগীয় মামলা দায়ের এবং তাৎক্ষণিক সংযুক্তির ঘটনা নজিরবিহীন। সরকারের গৃহীত এমন পদক্ষেপ সকল প্রকার দুর্নীতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
সূত্র জানায়, আগামী রোববার তদন্ত কর্মকর্তা তার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন। তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এরপর অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে স্থায়ী বরখাস্তসহ আরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: সাব-রেজিস্ট্রার জাকিরের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ, নির্লিপ্ত দুদক
এর আগে, সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য, ঘুষ গ্রহণ, দলিল নিবন্ধনে অনিয়ম, সাধারণ সেবা প্রার্থীদের হয়রানি, দালালচক্রের সঙ্গে যোগসাজশ, কর্মস্থলের অফিস কক্ষে মাদক সেবনসহ নানা অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছিল। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে দ্য ফিন্যান্স টুডে'তে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি প্রশাসনের উচ্চ মহলের নজরে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের হুমকি, হামলা ও অপহরণের চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।
গণমাধ্যমকর্মীর উপর হামলা
গত ২৭ এপ্রিল (সোমবার) দুপুরে দেশ টিভির প্রতিনিধি দেওয়ান ইমনসহ বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী দলিল লেখক সমিতির নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচনী প্রচারনার নিউজ করতে সাভারে যান। এসময় সেখানে সাব রেজিস্ট্রার মোঃ জাকির হোসেনের পক্ষে কাজ করছিলো অনুমোদনহীন পোর্টালের বহিরাগত কয়েকজন লোক। বিষয়টি স্থানীয় সংবাদকর্মীদের নজরে আসলে তারা বহিরাগত লোকজনের পরিচয় জানতে চান। এসময় স্থানীয়রা তাদেরকে আটক করে পরিচয় জানতে চাইলে সাব রেজিস্ট্রার তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে সংবাদ কর্মীদের উপর হামলা করে এবং দেশ টিভির প্রতিনিধি দেওয়ান ইমনকে অপহরনের চেষ্টা চালায়। এই ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় দেওয়ান ইমনকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
দূর্নীতিবাজ সাব রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছেন সাভারের সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নের্তৃবৃন্দ।
সূত্র মতে, টাঙ্গাইল জেলার মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান জাকির হোসেন ২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরবর্তীতে লক্ষীপুরের কমলনগর, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এবং হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় দায়িত্ব পালন শেষে তিনি সাভারে পদায়ন পান। সব মিলিয়ে মাত্র ৯ বছরের চাকরি জীবন। অথচ এই অল্প সময়েই দুর্নীতির সংজ্ঞাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
অস্বাভাবিক সম্পদ
সাভারের বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, মোটা অংকের ঘুষ গ্রহন, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে পাহাড়সম অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
আরও পড়ুন: সাব-রেজিস্ট্রার জাকিরের এত সম্পদের উৎস কি?
অভিযোগ রয়েছে, মাসিক ৫০ হাজার টাকার কম বেতনে চাকুরীরত এই কর্মকর্তা গত এক বছরে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে ২০ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ গড়েছেন।
দ্য ফিন্যান্স টুডের একটি চৌকস টীম এই বিষয়ে নিবিড় অনুসন্ধান চালিয়ে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী মনিরা সুলতানার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। এছাড়া, রাজধানীর পাশাপাশি নিজের গ্রামের বাড়িতে জাকির হোসেন কয়েক দাগে নিজের নামে এবং অন্য নামে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন। সূত্র মতে, এসব সম্পদের একটি অংশ নিজের আত্মীয়স্বজনের নামেও কিনেছেন চতুর জাকির।
জাকিরের হোসেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাহমহল রোডে প্রায় ২৫০০ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট (আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা) ক্রয় করেন। পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ৫ কাঠা জমি ক্রয় করে সেখানে ১০ তলা একটি ভবন নির্মাণ করছেন, যার সম্ভাব্য মূল্য ৬ কোটি টাকারও বেশী।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলখ্যাত তেলিনা এলাকায় জাকির হোসেনের ৫৪ শতাংশ জমি রয়েছে। সরকারি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে যার মূল্য দলিলে দেখানো হয়েছে ৩০ লক্ষ ৫৫ লাখ টাকা। অথচ উক্ত জমির বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ন্যায্যমূল্য কয়েক কোটি টাকারও বেশি।
এছাড়া, তেলিনা এলাকায় তিনি দোতলা একটি মার্কেটসহ ১১ শতাংশ জমি ক্রয় করেন যেখানে ৩০ থেকে ৪০টি দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের জমি দখল করে এই মার্কেট ও একটি বাংলো বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।
তেলিনা এলাকার অন্যত্র তিনি সাড়ে ৮ শতাংশ জমি কিনেছেন যার মূল্য দলিলে ৩ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা দেখানো হলেও বর্তমান মূল্য আরও বেশী বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জাকির হোসেন মির্জাপুর উপজেলার বাওয়ার কুমারজানি মৌজার পৌর মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় কিনেছেন ১ বিঘা জমি ৫ কোটি টাকা দিয়ে। পাশাপাশি প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পোল্ট্রি খামার গড়ে তোলা হয়েছে।
এছাড়াও, শ্বশুরবাড়িতে নিজের স্ত্রী, শ্বশুর ও শাশুড়ীর নামে জাকির কয়েক একর জমি কিনেছেন যার মধ্যে ৩ একর জমিতে একটি মাছের ঘেরও করেছেন এবং অন্যত্র গবাদিপশুর একটি খামার তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, জাকির হোসেনের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য প্রায় ১ কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল গাড়ি (ঢাকা মেট্রো- জিএ ২৫-২১২৭) এবং তার স্ত্রীর জন্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের আরেকটি গাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
